আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৫ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩২

প্রবন্ধ

সরকারী অবিমৃশ্যকারিতার শিকার পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা

ঋক চট্টোপাধ্যায়


পশ্চিমবঙ্গের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও ভর্তি সংক্রান্ত এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই অরাজকতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। তৃণমূল শাসনে গোটা রাজ্যের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাটাই যখন চিতায় উঠতে চলেছে তখন এই ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার বিশেষ অবকাশ থাকেনা। তবে বারংবার একই ঘটনার প্রভাবে বিরক্তি উৎপাদন তো হতেই থাকে। উচ্চশিক্ষায় যুক্ত একজন শিক্ষক হিসাবে এরকম একটি অব্যবস্থা দেখলে যুগপৎ বিরক্তি ও রাগ জন্মায়। রাজ্যের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আজ যে জট তৈরি হয়েছে তা কেবলমাত্র প্রশাসনিক উদাসীনতার ফল নয়, বরং বহুদিনের রাজনৈতিক কৌশল এবং দায়িত্বহীন জনমোহিনী রাজনীতির সম্মিলিত প্রতিফলন। সরকার শিক্ষার সার্বজনীনতার কথা বললেও বাস্তবে এমন এক অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে, যা হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের হতবাক করে তুলেছে। আজ শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকেও রাজনৈতিক লেনদেনের বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। অবশ্য যাদের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস হল অবাধ টেকাটুকি, শিক্ষাঙ্গনকে অরাজকতার আঁতুরে পরিণত করা, সরকারি দায়িত্ব পেয়ে তারা যে রাজ্যের শিক্ষাকেই লাটে তুলবে তা আর নতুন কি! গোটা রাজ্যের সরকারি উচ্চশিক্ষার পরিসরকে বিগত দেড় দশক ধরে যেভাবে অব্যবস্থায় মুড়ে ফেলা গেছে তাতে রাজ্যের শিক্ষিত যুবসমাজ উচ্চশিক্ষার তাগিদটাই আজ হারিয়ে ফেলেছে। এর সর্বশেষ সংস্করণ হল উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে বেনজির জটিলতা। প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলপ্রকাশ, কাউন্সেলিং এবং ভর্তি সব কিছুই থমকে গেছে একটি প্রশ্নে - কে ওবিসি, কে নয়?

এই অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০১০ সালের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রণীত ওবিসি তালিকা, এবং সেই তালিকার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়। ২০২৪ সালের মে মাসে এক বিস্ফোরক রায়ের মাধ্যমে আদালত জানিয়ে দেয় যে, রাজ্য সরকারের ঘোষিত তালিকা আইনি বিচারে টেকে না, এবং সেটি প্রণীত হয়েছে এমনভাবে, যা প্রমাণভিত্তিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রায় ১.৬ লক্ষ ওবিসি শংসাপত্র এই রায়ের পর বাতিল হয়ে পড়ে, যার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের। সেই সমস্ত তরুণ-তরুণী, যাঁরা সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসেছেন, কাউন্সেলিংয়ের অপেক্ষায় আছেন কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংরক্ষণের আশা করেছিলেন তাঁদের জীবনে হঠাৎ যেন এক অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। এ যেন পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ জানতে পারা যে আমি আর পরীক্ষার্থীই নই। শুধু মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর কিংবা পূর্ব মেদিনীপুর নয় গোটা রাজ্যজুড়েই অগণিত শিক্ষার্থীর মধ্যে আজ হতাশার ফল্গুধারা বহমান। যারা এরপরেও কিছুটা আলো খুঁজছিল, হাইকোর্টের রায় যেন তাদের সেই অল্পটুকু আলোর উৎসকেই চিহ্নিত করে নির্বাপিত করে দিল।

এই সংকটের গোড়ায় পৌঁছতে হলে যেতে হবে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাম সরকার যে ওবিসি তালিকা তৈরি করেছিল, তা ছিল মূলত কেন্দ্রীয় জাতীয় ওবিসি কমিশনের সুপারিশ এবং NSSO (২০০১)-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত। সেই সময় রাজ্যে ওবিসি জনসংখ্যার আনুমানিক হার ধরা হয়েছিল ১৭%-এর মতো, যেখানে মূলধারার অনেক পেশাজীবী এবং সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ হিন্দু ও মুসলিম গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ২০১১ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এক নতুন সংরক্ষণনীতি, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল ভোটব্যাঙ্ক পোক্ত করা। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেই একলপ্তে ৭৩টি নতুন গোষ্ঠীকে ওবিসি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে, যার মধ্যে ৪৮টির বেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের। তবে এই সংযোজন ছিল না কোনও সাংবিধানিক কমিশনের সুপারিশে, ছিল না সমাজবিজ্ঞানীদের মতামত, এমনকি কোনও পরিসংখ্যানগত জরিপও নয়। যেন কেউ রাতে ঘুম থেকে উঠে একটি পছন্দের তালিকা তৈরি করে সকালে সরকারি গেজেটে ছাপিয়ে দিলেন - এমনই নির্বাহী স্বেচ্ছাচার। ফলস্বরূপ সমাজকর্মী অমলচন্দ্র দাস হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন, যেখানে প্রশ্ন তোলা হয় - কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি এক নির্বাহী আদেশে ওবিসি স্বীকৃতি দেওয়া আদৌ সংবিধানসম্মত কিনা?

এই প্রশ্নের মূলে রয়েছে সংবিধানের ১৫(৪) এবং ১৬(৪) ধারার একটি মৌলিক শর্তঃ সংরক্ষণ দিতে গেলে প্রমাণ করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী আর্থ-সামাজিক এবং শিক্ষাগত দিক থেকে বাস্তবিকই পশ্চাৎপদ। শুধু কষ্টার্জিত দরিদ্র নয়, সেটি হতে হবে প্রমাণযোগ্য 'institutional backwardness'। আর এই কাজটি করতে হলে প্রত্যেক রাজ্যকে গঠন করতে হয় একটি আলাদা ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস কমিশন, যা সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও শিক্ষাগত তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তালিকা প্রস্তুত করে। ১৯৯২ সালের ঐতিহাসিক 'ইন্দ্রা সাহনি বনাম ভারত সরকার' মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই নীতি সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই পথ ধরেনি। বরং তারা হাঁটলেন বিপরীত পথে - ভোটার তালিকার গণনা করে ওবিসি তালিকা তৈরি করার পথে। এই প্রবণতাকে এক রাজনৈতিক দুষ্টচক্র বলা যেতে পারে, যেখানে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর প্রয়াসে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার শরীরে ধীরে ধীরে ক্ষত তৈরি করা হয়।

এই অবস্থায় যদি সত্যিই সরকার এই সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত - সংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ এবং তথ্যনির্ভর ওবিসি কমিশন গঠন করা। এই কমিশন কেবলমাত্র রাজনৈতিক অনুগতদের দিয়ে গঠিত এক 'সুবিধাভোগী পরিষদ' নয়, বরং সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষানীতিবিদের সমন্বয়ে গঠিত এক নির্ভরযোগ্য পর্যালোচনাকারী সংস্থা হতে হবে। এই কমিশনের মাধ্যমে রাজ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষাগত পরিসংখ্যান এবং কর্মসংস্থানের হারের উপর ভিত্তি করে একটি সার্বিক জরিপ চালাতে হবে। জরিপটি হতে হবে NSSO, NSO কিংবা NCERT-র পরিসংখ্যানিক মান অনুসরণে, যাতে কোনও রাজনৈতিক পক্ষপাতের সন্দেহ না থাকে। এই তালিকা পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকারের সমন্বয় ও পর্যালোচনায় পাঠাতে হবে, কারণ সংরক্ষণ নীতি একটি যৌথ সাংবিধানিক দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তালিকার মধ্যে যদি সমন্বয় না থাকে, তাহলে তা নিয়ে পুনরায় আইনি জট তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন 'রেট্রোস্পেকটিভ প্রোটেকশন'-এর একটি শক্তিশালী ও সুনির্দিষ্ট নীতি, যাতে ইতিমধ্যে যারা ওবিসি হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন, তাঁদের অধিকার সংরক্ষিত থাকে। নয়তো, সমাজের এক বৃহৎ অংশ, যারা বিগত এক দশকে এই তকমার ভিত্তিতে নিজেদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেছে, হঠাৎ নিজেকে এক 'কাগজে বাতিল জনগোষ্ঠী' হিসেবে আবিষ্কার করবে। এই সংকটে রাজ্য সরকারের সুপ্রিম কোর্টে করা আপিল একমাত্র সম্ভাব্য পথ নয়, বরং আপিলকে পাশে রেখে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক হতে পারত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তৃণমূল সরকার কোনওকালেই সেই সদিচ্ছা দেখায় না।

আসলে এক্ষেত্রে প্রশ্ন আইনি সমাধানের সদিচ্ছার নয়, প্রশ্নটি হল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের। পশ্চিমবঙ্গ সরকার, বিশেষত তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রশাসন, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে খুশি রাখতে গিয়ে সংরক্ষণকে এক প্রকার "বিনামূল্যে শংসাপত্র বিতরণ" কর্মসূচিতে পরিণত করেছে। উন্নয়নের জায়গায় এসেছে সার্টিফিকেট, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এসেছে তড়িঘড়ি করা শ্রেণি-স্বীকৃতি। বাস্তবে, ২০১১ সালের পর থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষাগত ও আর্থিক উন্নয়নে কোনো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ছাত্রদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ ২০০৪ সালে ছিল ১২.৪%। তা এখন মাত্র ১৪.৮%-এ দাঁড়িয়েছে, যেখানে জাতীয় গড় ১৯%-এর কাছাকাছি। ১৫ বছরে এই নগণ্য অগ্রগতি স্পষ্ট করে দেয় যে, সরকার উন্নয়নের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়েছে "পরিচয়পত্র দিয়ে খুশি রাখার রাজনীতি"-তে। সাচার কমিটির রিপোর্ট (২০০৬) থেকে শুরু করে ৭৫তম NSSO রাউন্ড (২০১৮) পর্যন্ত সমস্ত তথ্যই ইঙ্গিত দেয়, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী আয়, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য - তিনটি ক্ষেত্রেই জাতীয় গড়ের নিচে রয়েছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এই তথ্যের ভিত্তিতে কোনও টেকসই হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। সংরক্ষণ, যা হতে পারত অন্তর্ভুক্তির হাতিয়ার, তা এখানে রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক প্রদর্শনীর। সংবিধান যেভাবে সংরক্ষণের কাঠামো গঠন করতে বলে, তা এখানে রীতিমতো মমতা ব্যানার্জির এঁকে দেওয়া ছবির মতো মনের খেয়াল। আর এই অবৈজ্ঞানিক প্রয়োগেই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি, বিচারব্যবস্থার হস্তক্ষেপ এবং সমাজে এক অব্যক্ত অসন্তোষ।

এই সমস্যাকে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হলে তাকাতে হবে অন্যান্য রাজ্যগুলোর দিকে, যারা একই প্রশ্নে বিপদে পড়েও শিক্ষণীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন, মহারাষ্ট্র সরকার ২০১৮ সালে মারাঠা সংরক্ষণ চালু করেছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ২০২১ সালে তা বাতিল করে দেয়, কারণ সেখানে যথাযথ আর্থ-সামাজিক জরিপ ও স্পষ্ট পশ্চাৎপদতার প্রমাণ ছিল না। বিহার সরকার ২০২৩ সালে একটি রাজ্যব্যাপী জাতিগত ও সামাজিক জরিপ পরিচালনা করেছে। সেই জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা সংরক্ষণ কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত। আবার তামিলনাড়ু সরকার, যারা সংরক্ষণের হার ৭০%-এর উপরে রেখেও বিতর্কের মুখে পড়ে না, কারণ তাদের রয়েছে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী এবং নিয়মিতভাবে আপডেট হওয়া ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস কমিশন। সেখানে সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়গামী হার ২৬% ছাড়িয়ে গেছে। তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ যেন এক অনিয়ম ও উদাসীনতার পরীক্ষাগার যেখানে তথ্যপ্রমাণ নেই, জরিপ নেই, আছে শুধু প্রচার আর প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন বুঝে নেয় যে শংসাপত্র ছাপাতে যতটা সহজ, ততটাই কঠিন সামাজিক ন্যায়ের কাঠামো তৈরি করা, তখন প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ধুয়ে-মুছে যায় ফেসবুক লাইভ আর কাগজের হেডলাইনে। অথচ এইসব কাগজে ছাপা প্রতিশ্রুতির দায় নিতে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ তরুণকে - যারা ভর্তি পরীক্ষার ম্যারাথন দৌড়ে জেতার পর এখন এক অদৃশ্য দেওয়ালে ঠেকে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই অব্যবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে। বেনজির ভাবে উচ্চমাধ্যমিক শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্নাতক স্তরে ভর্তি জুন মাসেও ঠিক করে শুরু করা যায়নি। কারণ, কেউ জানেনা ওবিসি শংসাপত্র নিয়ে কী করা হবে। উচ্চশিক্ষা দপ্তর মুণ্ডুহীন মুরগীর মত এটাও হয়, ওটাও হয় করে গেছে। এর একমাত্র কারণ নবান্ন থেকে কোনও নির্দেশ নেই। রাজনৈতিক ধান্দায় এলোমেলো করে দেওয়া অবস্থায় রাজনীতির কারবারিরা মৌন ব্রত নিয়েছেন। ফলে তাদের অঙ্গুলিহেলনে চলা শিক্ষাদপ্তর কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। আর তার ফলে ভর্তি নিয়ে কোন স্পষ্ট নির্দেশিকা নেই। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা জানেন না কোন শংসাপত্রের বৈধতা আছে কোনটার নেই। ফলে তারাও আজকে দায় ঘাড়ে নিয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। এর ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছে ভর্তি হতে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা। এ এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। পরীক্ষায় সফল হওয়ার পরেও ভর্তি হওয়া নিয়ে এই অনিশ্চয়তা কোনো ছাত্রেরই কাম্য নয়। অথচ রাজ্যের প্রশাসনের অপদার্থতায় তারাই আজ সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে।

এই রাজ্যের রাজনীতি আজ এমন এক জড়ত্বের জায়গায় এসে ঠেকেছে, যেখানে বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার স্পর্ধা বা সদিচ্ছা - কোনোটাই আর দেখা যায় না। বিরোধী দলগুলোও যেন এই ওবিসি সংরক্ষণ জটিলতাকে ঘিরে নিজের ঘর গোছাতে ব্যস্ত। বিজেপি এই সুযোগে বরাবরের মতো মুসলিম তোষণের অভিযোগ তুলছে, কিন্তু তারাও সংরক্ষণ নিয়ে কোনও সুস্পষ্ট বিকল্প রূপরেখা দিচ্ছে না। সংখ্যালঘুদের বাদ দিয়ে ওবিসি কাঠামো কীভাবে নতুন করে ভাবা যায়, কোন তথ্যভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত - সেই প্রশ্নে তাদেরও কোনও স্পষ্টতা নেই। ফলে তাদের কথাবার্তাও কেবল চেনা রাজনৈতিক কৌশলের ঘূর্ণিপাকে আটকে আছে।

বামেদের অবস্থান নিয়েও হতাশা জমছে। তারা মুখে বলছে তালিকা হওয়া দরকার বৈজ্ঞানিক জরিপ আর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনে, কিন্তু নিজেদের আমলে এই তালিকা তৈরির পদ্ধতি কতটা রাজনৈতিক হিসাব কষে করা হয়েছিল, সেই দায় স্বীকার করে তারা আজও একটা দৃঢ় অবস্থানে আসতে পারছে না। আসলে তারাও বিষয়টাকে কেবল ভোটের অঙ্কে দেখছে - কারা ক্ষুব্ধ হবে, কারা সমর্থন করবে, সেই যোগবিয়োগের হিসেব এখনও মিলছে না। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও জোরালো প্রতিবাদ উঠে আসছে না। তারা এটিকে কেবল 'আইনি জটিলতা' বলে পাশ কাটিয়ে চলেছে। রাজনৈতিক বোঝাপড়ার অভাবে গোটা বিষয়টিকে এক সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনে রূপ দিতে পারছে না তারা।

আর নাগরিক সমাজ? বলা যায়, এই প্রশ্নে তাদের ভূমিকা প্রায় অদৃশ্য। একটা সময় ছিল, যখন শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থা দেখা দিলেই খোলা চিঠি, আলোচনা, বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া উঠে আসত। বিশ্ববিদ্যালয়-চত্বরের বাইরে সামাজিক প্রেক্ষাপটেও আলোচনা হতো - শিক্ষা নিয়ে, সংরক্ষণ নিয়ে, সুযোগ ও বঞ্চনার জটিল বিন্যাস নিয়ে। এখন চারপাশে নিঃশব্দতা। হয়তো সবাই আজকাল বুঝে গেছে, বেশি কথা বললে কোনও না কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হয় - ফান্ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে, মামলায় নাম ঢুকে যেতে পারে, অথবা মিডিয়া চুপ করে যেতে পারে। ফলে প্রতিবাদ আর প্রতিক্রিয়া আজকাল ইচ্ছাকৃতভাবে দমিয়ে রাখা হয়।

আসলে এই নীরবতা, এই কৌশলী মুখ লুকোনোই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। প্রশাসনের ভুলের ভার যখন ছাত্র-ছাত্রীদের ঘাড়ে চাপানো হয়, তখন নাগরিক সমাজের এভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া একটা মৌন অপরাধের শামিল। আজ যে ছাত্রটা নিজের মেধা দিয়ে পরীক্ষায় ভালো করেছে, সে জানে না, তার ভর্তি হবে কিনা - শুধু একটা শংসাপত্র বৈধ কি অবৈধ, সেই অনিশ্চয়তায় সে আটকে আছে। সে জানে না, সে কলেজে পড়তে পারবে কিনা, অথচ যারা শংসাপত্র বিলি করেছিল, তাদের মুখে তালা।

রাজ্য সরকার শিক্ষার কথা বলে, সর্বজনীনতার কথা বলে - কিন্তু বাস্তবে শিক্ষাকে তারা এমন একটা জটিল রাজনৈতিক যন্ত্রে পরিণত করেছে, যেখানে ছাত্র মানে শুধু ভোটদাতা, আর শংসাপত্র মানে একরকম 'দলীয় অনুগ্রহ'। এই শংসাপত্র ভিত্তিক রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ফলে শিক্ষার অন্তঃসারটাই হারিয়ে গেছে। ছাত্রদের হাতে এখন বইয়ের চেয়ে বেশি জায়গা নিচ্ছে কোর্ট-কেসের কপি, সাদা কাগজে জমা দেওয়া আবেদনপত্র আর অফিসে অফিসে ঘোরা প্রতীক্ষার তালিকা। এটাই এখনকার বাস্তব। ভর্তি পিছিয়ে যাচ্ছে, ছাত্ররা হতাশ হচ্ছে, অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন - আর সরকার, বিরোধী দল, এবং শিক্ষিত সমাজ সবাই মিলে এক রকম নিষ্ক্রিয়, অসাড়, আর কিছুটা নির্লজ্জ দর্শকের ভূমিকায় বসে আছেন।

আজ এই ওবিসি সংরক্ষণ ইস্যু নিয়ে রাজ্যে যে অব্যবস্থা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি নীতি বা একটি তালিকা নয় - এটি আসলে গোটা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিবশতার প্রতিচ্ছবি। শিক্ষার মতো একটি মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে যখন অনিশ্চয়তা এত প্রবল হয়ে ওঠে, তখন সেই রাজ্যের শাসনব্যবস্থার নৈতিক বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। আজ যেসব ছাত্র-ছাত্রী অন্ধকারে দিশাহীন হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে ফটকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাঁরা শুধুমাত্র একটি শংসাপত্রের আইনি বৈধতা নিয়ে দিনের পর দিন উদ্বেগে কাটাচ্ছেন - তাঁদের দুঃখ, তাঁদের অসহায়তা শুধুই এক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি এক নীতিহীন রাজনীতির ফল যা দীর্ঘ সময় ধরে সমাজকে বিষিয়ে তুলেছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি, সংরক্ষণ কোনো দয়া নয়, কোনও উপকারের ব্যবস্থা নয় - এটি সাংবিধানিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিভূমি। অথচ আজ তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক তামাশার অস্ত্র। শিক্ষাকে যাঁরা ক্ষমতা রক্ষার 'কারেন্সি' বানিয়ে ফেলেছেন, তাঁরাই আজ এই অবস্থার জন্য দায়ী। এই রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ঠান্ডা অঙ্কে যে গনগনে ক্ষত তৈরি হচ্ছে সমাজে, তার ব্যথা শুধু ছাত্র-ছাত্রীরাই বুঝছে।

প্রশ্ন হল - এই অসহায়তা আর কতদিন চলবে? ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কি প্রতিবারই এমন শূন্যে ঝুলে থাকবে? কবে রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নীতির জায়গা থেকে কেউ বলবে - "এই অন্যায় আর নয়"? হয়তো খুব শিগগির নয়, কিন্তু এই অনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষার ভিতরে-বাইরে যতবার গর্জে উঠবে একটা প্রশ্ন, যতবার উঁকি দেবে একটা প্রতিবাদ, ততবারই নতুন করে জন্ম নেবে পরিবর্তনের সম্ভাবনা। শিক্ষার প্রশ্নে, অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে - এই অব্যবস্থাকে নীরবে মেনে নেওয়ার সময় আর নেই। যারা মেধা, শ্রম ও স্বপ্ন নিয়ে লড়ছে, তারা একটা ন্যায়সঙ্গত কাঠামোর দাবিদার। আর সেই কাঠামো গড়ার দায় কেবল সরকারের নয় - যতখানি নাগরিক সমাজের, শিক্ষকদের, রাজনৈতিক নেতৃত্বের, এবং আমাদের সকলের। হোক প্রতিবাদ, গড়ে উঠুক আন্দোলন - কেবল শংসাপত্র নিয়ে নয়, শিক্ষার অধিকার নিয়ে, ন্যায়ের কাঠামো নিয়ে। নাহলে আগামী দিনে শুধু ভর্তি পরীক্ষার নয়, আমাদের বিবেকেরও ফল প্রকাশ আর হবে না।