আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৫ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩২
প্রবন্ধ
ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক
নিখিলেশ সেন
ভারতের সংবিধানের মুখবন্ধে দুটি শব্দ নিয়ে দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আপত্তির শেষ নেই। শব্দ দুটি হল ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক। সম্প্রতি আরএসএস-এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী জরুরি অবস্থার ৫০ বছর উপলক্ষে কংগ্রেসের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন যে এই দুটি শব্দ জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের মুখবন্ধে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতএব, এই দুটি শব্দকে বাতিল করা উচিত। তিনি বলেন যে বাবাসাহেব আম্বেদকরের সংবিধানে এই শব্দ দুটি ছিল না, অতএব তা বাতিল করতে হবে।
জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করতে গিয়ে ভারতের সংবিধানের মুখবন্ধের অন্তর্ভুক্ত এই দুটি শব্দের বিরোধিতা কেন করতে হবে তা বুঝতে হলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভারতের সংবিধানকে আরএসএস কোনোদিনই মান্যতা দেয়নি। প্রাক্তন আরএসএস প্রধান মাধব গোলওয়ালকার সংবিধান গৃহীত হওয়ার সময় লাগাতার তার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন যে সংবিধানটিতে ভারতীয়তা নেই, 'মনুস্মৃতি'র মতন প্রাচীন ভারতীয় সংহিতাকে সংবিধানে কোনো মান্যতা দেওয়া হয়নি। মনে রাখতে হবে যে 'মনুস্মৃতি' ভারতের জাতিব্যবস্থা কায়েম করে জাতি ভিত্তিক শোষণের পক্ষে লেখা একটি প্রাচীন গ্রন্থ যার বিরোধিতা করেছিলেন আম্বেদকর-সহ ভারতের সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করা বহু নেতা। সেই 'মনুস্মৃতি' যা জাতিপ্রথার মতাদর্শগত ভিত্তি তা কেন ভারতের সংবিধানে জায়গা পায়নি, তা নিয়ে আরএসএস চিন্তিত ছিল। অতএব, গোলওয়ালকর যে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে তফশিলী জাতি ও জনজাতির জন্য প্রযোজ্য সংরক্ষণের বিরোধিতা করবেন তা বলা বাহুল্য।
আসলে আরএসএস ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় যেখানে শুধুমাত্র যে শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার খর্ব করা হবে, তা নয়। আরএসএস কল্পিত হিন্দুরাষ্ট্র আদতে সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করে হিন্দুদের নামে সাধারণ মানুষের শোষণের জন্য তৈরি করা একটি রাষ্ট্রযন্ত্র যা ভারতের সংবিধান এবং সহস্র বছরের সহিষ্ণুতার আদর্শকে হত্যা করে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের পদতলে গোটা ভারতকে ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’-এর শেকলে বাঁধতে চায়। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটির বিরোধিতা করা আরএসএস-এর কাছে অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক শব্দটি ইউরোপ তথা আমেরিকার মাটিতে যে দ্যোতনা বহন করে ভারতের মাটিতে তা করে না। ভারতের সংবিধান রচয়িতা বাবাসাহেব আম্বেদকরের ধারণায় প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তখনই কায়েম করা সম্ভব হবে যখন আজকের শোষিত ও নিষ্পেষিত শ্রেণি কালকের শাসক শ্রেণিতে পরিণত হবে এবং চক্রের মতন এই স্থিতি সদা পরিবর্তনশীল থাকবে। কিন্তু ভারতে শ্রেণি ও জাতি বিভাজন বর্তমান। হাজার হাজার বছর ধরে কিছু মানুষ অন্য মানুষের উপরে হুকুম জারি করে এসেছে, তাদের শাসন ও শোষণ করে এসেছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় আম্বেদকর, নেহরুর মতন নেতারা এই শ্রেণির মানুষকে অধিকার দিতে চেয়েছিলেন। যেহেতু তারা দুর্বল এবং ক্ষমতার অধিকারী নয়, রাষ্ট্রকে এই মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র যদি শুধু পুঁজিপতিদের স্বার্থবহন করে, তাহলে আম্বেদকর বর্ণিত গণতন্ত্রের ধারণা কখনই বাস্তবায়িত হতে পারবে না। অতএব, ভারতের দরিদ্র বঞ্চিত জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের দায়িত্বকে রেখান্বিত করার প্রয়োজনেই সংবিধানের মুখবন্ধে সমাজতান্ত্রিক শব্দটি রয়েছে।
আরএসএস নেতার সম্ভবত স্মৃতিভ্রম হয়েছে। তাই তিনি ভুলে গেছেন যে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার পরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। জরুরি অবস্থার আগেই ১৯৭৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাদের বিখ্যাত রায়ে ঘোষণা করে যে ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অঙ্গ। সংবিধান সংশোধন করা হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে সংবিধান থেকে কখনই বাদ দেওয়া যাবে না। এত পুরোনো কথা যদি মনে নাও থাকে ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন সেটাও কি উনি ভুলে গেছেন? এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের মুখবন্ধ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক কথাদুটি বাদ দিতে অস্বীকার করেন। এরপরেও আরএসএস তাদের উগ্র হিন্দুবাদী সাম্প্রদায়িক মতাদর্শকে দেশের মতাদর্শে পরিণত করার স্বার্থে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতান্ত্রিক শব্দদুটিকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে চলেছে।
আসলে ভারতের মতন দেশে গণতন্ত্র স্থাপিত হওয়ার পূর্বশর্ত হল ধর্মনিরপেক্ষতা। একটি বহু ধর্ম ও বর্ণের দেশে কোনো একটি ধর্মকে যদি রাষ্ট্রের ধর্ম হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু যে সংখ্যালঘুর ক্ষতি করে তাই নয়, তা দেশের মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে। পাকিস্তানের আজকের হালের নেপথ্যে তাদের ধর্মের ভিত্তিতে দেশগড়ার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশে বারংবার মৌলবাদের উত্থান, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের অভাব এই বার্তাই দেয় যে ধর্মনিরপেক্ষতা না থাকলে গণতন্ত্র সফল হতে পারে না। আরএসএস অবশ্য গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতেই চায়। তাই তাদের স্বপ্নের 'হিন্দুরাষ্ট্র' স্থাপন হলে গণতন্ত্রের কোনো জায়গা থাকবে না তা তারাও জানে। ভারতের গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সংবিধানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখা সকল মানুষের কর্তব্য।
অন্যদিকে, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে দীর্ঘ তিন দশকের বিশ্বায়নের নীতির ফলে ভারত যেমন সমাজতান্ত্রিক নীতি থেকে অনেকটা সরে এসেছে, তেমনি এর ফলে গরিব মানুষের বিশেষ উপকার হয়নি। তবু, মিড-ডে মিল স্কিম, ১০০ দিনের কাজ, রেশনে বিনামূল্যে খাদ্যসরবরাহ সহ বহু জনহিতকর নীতি ভারতে সরকার চালায় যা গরিব মানুষের বিশেষ কাজে লাগে। এই নীতিগুলিই যে সমাজতন্ত্রের চিহ্ন বহন করছে তা নয়। কিন্তু এই নীতির মাধ্যমে সরকারের যে সাধারণ গরিব মানুষের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে তা প্রমাণ পায়। ভারতের সংবিধানে বর্ণিত সমাজতান্ত্রিক শব্দটি মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের যে দায়বদ্ধতা এবং কর্তব্য রয়েছে তার নিশান বহন করে। এটি শুধুমাত্র একটি শব্দ নয়। একে সংবিধান থেকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হল আগামীদিনে ভারতের গরিব মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের হাত তুলে নেওয়া। প্রগতিশীল শক্তিদের ক্ষেত্রে এই শব্দটি আগামী লক্ষ্যের কথা ভাবাবে। এর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু দেশের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য কমাবে, গরিব মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে এমন একটি কল্পনা যদি করা যায়, তাহলে তার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক উপাদান থাকতে বাধ্য।
আরএসএস জরুরি অবস্থার যে সমালোচনা করছে, তার মধ্যেও একটি দ্বিচারিতা রয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার যে নীতি কংগ্রেস সরকার সেই সময় নিয়েছিল তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রগতিশীল শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আজ আরএসএস যেই অধিকার হরণ নিয়ে কংগ্রেসের সমালোচনা করছে, বিজেপি সরকারের নেতৃত্বে যে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি আছে দেশে তা নিয়ে তারা স্বাভাবিকভাবেই কোনো কথা বলছে না। বিরোধী দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করে দেওয়া, বিরোধীদের লাগাতার ইডি-সিবিআই ইত্যাদির মাধ্যমে ভয় দেখানো, প্রতিবাদীদের জেলে বন্দী করে রাখা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লাগাতার আক্রমণ সংগঠিত করা, তাদের অধিকার খর্ব করা, সহ নানা জনবিরোধী এবং গণতন্ত্র বিরোধী নীতি মোদী সরকার দেশে চালাচ্ছে। এই সমস্ত কর্ম আরএসএস-এর আশীর্বাদধন্য এবং তাদের মদতে হচ্ছে। তাই আজ যখন আরএসএস জরুরি অবস্থার সমালোচনা করার ভান করছে এবং সংবিধানের মুখবন্ধকে পরিবর্তন করার দাবি জানাচ্ছে, তখন তার বিরোধিতা করা আবশ্যিক। ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আগামী প্রজন্মের হাতে আমরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ভারত তুলে দিতে পারব কি না, তার উপর।