আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৫ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
নরক গুলজার
সকালে উঠেই যদি নাকে পুতিগন্ধ আসে, খবরের কাগজে চোখ রাখলেই যদি গা গুলিয়ে ওঠে, কান পাতলেই যদি আর্তনাদ চোখে আসে তাহলে আপনি নির্দ্বিধায় ধরে নিতে পারেন পশ্চিমবঙ্গে আছেন। রাজ্য সরকারের পরিচালনায় অপশাসনের যে যাত্রাপালা বিগত ১৪ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে আজ তার তান্ডব পর্ব শুরু হয়েছে। বিকৃত রাজনীতির যে আগল ২০১১ সাল পরবর্তী সময়ে খুলে গিয়েছিল, সেই অবারিত দ্বার দিয়ে সমাজের সমস্ত অন্ধকার জগতের পিশাচরা আজ রাজপথে নিজেদের নিশান রেখে রাজ্যে নরক গুলজার তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু এটা মোটেই প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়। বরং বলা যেতে পারে ১৯৭২-এর জরুরী অবস্থার কান্ডারী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের যোগ্য উত্তরসূরী মমতা ব্যানার্জির অনুপ্রেরণায় আজ রাজ্যকে সুজনের বধ্যভূমিতে পরিণত করা গেছে। রাজনৈতিক একচেটিয়া ব্যবস্থার, ক্ষমতার যে একচ্ছত্র দাপট, গণতান্ত্রিক সমস্ত রীতিনীতির জলাঞ্জলির যে ভিত্তিপ্রস্তর জরুরী অবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল, সিদ্ধার্থ রায় নয়, মমতা ব্যানার্জি হল তার সফল রূপকার। একথা ভাবার কোনো কারণ নেই যে শুভেন্দু অধিকারী তথা বিজেপির হাত ধরে এই কুনাট্যের ইতি ঘটবে, কারণ এযাবৎ বলা প্রতিটি কথা বিজেপি শাসিত রাজ্য ও দেশের জন্যও সমান প্রযোজ্য।
হাতরস থেকে কামদুনি, উত্তরপ্রদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ - মেয়েদের ওপর অত্যাচার এবং পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের আড়াল করতে রাজ্য প্রশাসনের বিপুল সক্রিয়তা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এ রাজ্যে কামদুনি, পার্ক স্ট্রীট কান্ড থেকে যে অরাজকতার সূচনা, আর. জি. কর হয়ে দক্ষিণ কলকাতা ল' কলেজ তার শেষতম নিদর্শন। এখানেই যে শেষ তা মোটেই ভেবে বসা যাবেনা। যে নারকীয়তার সূচনা হয়েছে, রাজনৈতিক অপশাসনের অবসান না ঘটলে এর সমাপ্তি নেই।
যেই কথাটি রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে একান্তই লজ্জার তা হল এই যে বিগত এক বছরের মধ্যে দুইজন ছাত্রী কলেজের পরিসরেই ধর্ষিতা হলেন। প্রথমজন, অভয়াকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হল আর. জি. কর হাসপাতালে। দ্বিতীয়জনকে ধর্ষিতা হতে হল, তাঁরই কলেজ অর্থাৎ দক্ষিণ কলকাতা আইন কলেজে। একটি সমাজ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা বিষিয়ে গেলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে সাধারণ ছাত্রীরা কলেজের প্রাঙ্গনে ধর্ষিতা হন। এইসব জঘন্য অপরাধের নেপথ্যে যথারীতি দেখা যাচ্ছে তৃণমূল আশ্রিত তথাকথিত ছাত্র বা যুব নেতাকে, যিনি বছরের পর বছর কলেজ প্রাঙ্গনে দাদাগিরি করে চলেছেন, কিন্তু প্রশাসন তথা পুলিশ নির্বিকার। তিনি এতটাই প্রভাবশালী যে অভিযুক্তদের নাম গোপন করে কেবল অদ্যক্ষর ব্যবহার করছে পুলিশ প্রশাসন। আদালতের কোনও নির্দেশ ছাড়াই কীভাবে এই নাম গোপনীয়তা বজায় রাখার খেলা চলছে, তার কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। পক্ষপাতদুষ্ট এই প্রশাসন নির্যাতিতা নয়, বরং অপরাধীদের সম্মান রক্ষায় অধিক সদর্থকভাবে সচেষ্ট।
এই ঘটনার উৎসে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অভয়া কাণ্ডে প্রকৃত অপরাধীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, প্রশাসনিক স্তরে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয়েছে, প্রমাণ লোপাটের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, মামলাকে দুর্বল করে তোলা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে এক সময় ভবানীপুর থানায় গিয়ে অভিযুক্তদের ছাড়াতে সক্রিয় হয়েছেন - সেই ঘটনা আজ আর কারও অজানা নয়। আজকের পুলিশও সেই একই রাজনৈতিক আদর্শে চলতে অভ্যস্ত হয়েছে।
পুলিশ এই সমস্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা বা তাদের শাসন করার দায়িত্ব পালনের থেকে অনেক সময় বেশি ব্যস্ত থাকছে, প্রতিবাদীদের দমন করতে। কসবায় প্রতিবাদী ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রেপ্তার, সাংবাদিকদের হেনস্তা, এবং পথ অবরোধকারীদের বিরুদ্ধে অকারণ লাঠিচার্জ - এসব কি কেবল আইন রক্ষার প্রয়াস? নাকি এই পুলিশ প্রশাসন আজ শাসকদলের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কাজ করছে? প্রশ্ন উঠছে: কোথা থেকে আসে পুলিশের এই 'স্বতঃপ্রণোদিত' তৎপরতা? একটি ক্ষেত্রেও কি পুলিশ দেখাতে পারবে যে উপর মহল থেকে আইনি নির্দেশ ছিল প্রতিবাদীদের দমন করার? যদি না থাকে, তাহলে কাদের স্বার্থে এই তৎপরতা? আসলে সত্যিটা হল, পুলিশের ভূমিকা কেবল পক্ষপাতদুষ্ট নয় - তারা আজ সরাসরি শাসকের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সিভিক ভলান্টিয়ার নামক কৃত্রিম কাঠামোর আড়ালে শাসকদলের দলীয় গুন্ডাদের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা হয়েছে। এবং সেই নিয়োগ ও ব্যবহার নিয়ে পুলিশের ভিতরে থেকে কখনও কোনও প্রশাসনিক প্রতিবাদ শোনা যায়নি। ফলে এই প্রতিষ্ঠান আজ রাজনৈতিক নির্দেশের যন্ত্রমাত্র।
আর এই সমগ্র ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষাঙ্গনেও সংগঠিত অনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। বিগত এক দশক ধরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন কার্যত স্থগিত। ফলে ছাত্রদের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, এবং সেই শূন্যস্থান দখল করেছে শাসকদলের তথাকথিত 'প্রাক্তনীরা'। তাঁরা আজ কলেজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। প্রশাসনের কোনও বৈধ পদে না থেকেও ছাত্র ভর্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, এমনকি অস্থায়ী নিয়োগে পর্যন্ত তাঁদের ছায়া পড়ে। কলেজ প্রশাসন, শিক্ষক, অধ্যক্ষ - সকলেই কার্যত তাঁদের ভয়েই দিন কাটান। গণতন্ত্রহীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি এখন পরিণত হয়েছে আধাসামরিক ছাউনিতে, যেখানে প্রশ্ন তোলা মানেই হয় অপমান, নয়তো বিতাড়ন।
এই অবস্থার জন্য কেবল রাজনৈতিক দল দায়ী নয়। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির শিক্ষক অংশটিও কি দায় এড়িয়ে যেতে পারে? কোন লোভে, কোন প্রত্যাশায় তাঁরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন - ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে। যখন ক্যাম্পাসে অপরাধ, হুমকি, ভয়, শ্লীলতাহানি, এমনকি ধর্ষণ ঘটে, তখন তাঁরা নিজেদের এবং নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে একান্ত পরিসরে আক্ষেপ করেন, কিন্তু প্রকাশ্যে শাসকের চোখে চোখ রেখে দাঁড়াতে পারেন না। কারণ তাঁরা নিজেরা হয়তো কোনও একটি পদের অপেক্ষায় অথবা উপাচার্যের পদে কার সুপারিশ প্রয়োজন - সেই হিসাব কষেন। এই শিক্ষিত নাগরিক সমাজের নির্লজ্জ ভণ্ডামিই আজকের অন্ধকার রাজনৈতিক পরিবেশের আসল চালিকাশক্তি।
আর এই ব্যবস্থাকে পাল্টানোর ক্ষমতা যাঁদের থাকার কথা, সেই বাম প্রগতিশীলরা এখনও কার অপেক্ষা করছেন জোরদার আন্দোলন সংগঠিত করার, তা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছেন না। দীর্ঘ শাসনের সময়কালে তাঁদের আমলেও ভুল হয়েছে - এই সত্য মেনে নিতে হবে। কিন্তু বাস্তব হল - তাঁদের আমলেও অপরাধ হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের শাস্তি হয়েছিল। গোটা প্রশাসন কোনও অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য ব্যবহৃত হয়নি। সেই সত্য তারা গলা ছেড়ে বলতে পারছে না। তারা যেন আজ অতীতের দায়ে ন্যুব্জ হয়ে গেছে। ফলত, তারা রাস্তায় নামতে পারছে না, জনমানসে আলোড়ন তুলতে পারছে না, এমন কোনও শক্তিশালী নাগরিক দাবি রাখতে পারছে না যা এই অন্ধকার কাটাতে সহায়ক।
এই অন্ধকার কাটাতে হলে শুধুমাত্র ভোট নয়, প্রয়োজন শিক্ষা ও সংস্কার ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু তা গড়ে তুলবে কে? শিক্ষক সমাজ যখন কেবল মৌনতা বেছে নেয়, নাগরিক সমাজ যখন নিজেদের কমফোর্ট জোনে নিরাপদ থাকতে চায়, এবং বিরোধী রাজনীতি যখন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে শুধুই হিসেব-নিকেশে ব্যস্ত, তখন আলো জ্বালানোর দায়িত্ব এসে পড়ে সেই ছাত্র-ছাত্রী, যুব সমাজের ওপর - যারা এখনও বিশ্বাস করে অন্যরকম এক রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব। এই নরকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে - পথে, কলমে, মননে। প্রশাসন যদি ন্যায়বিচার না দেয়, তবে মানুষকেই সেই বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে গণতান্ত্রিক শক্তিতে। আজ সময় এসেছে ভয় সরিয়ে সত্য বলার, নিঃশব্দ সম্মতি ভেঙে পথে নামার। কারণ যদি আমরা না বলি, তবে পরবর্তী ঘটনাটি আমাদের ঘরের দোরেই দাঁড়িয়ে থাকবে। এই রাজনৈতিক অন্ধকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতেই হবে। নইলে নরক গুলজার হবে রাজ্যের নতুন পরিচয়পত্র।