আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ ত্রয়োদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুলাই, ২০২৫ ● ১৬-৩২ আষাঢ়, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
তামান্নাদের ভুলতে দেব না তো!
১০ বছরের ছোট্ট তামান্না চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তার পরিযায়ী বাবাকে সে বলেছিল, 'এবার ঘরে ফিরলে একটা ক্লিপ কিনে দিও কিন্তু...' ছোট্ট মানুষ, ছোট্ট আশা। বাবা অন্য রাজ্যে কাজের জন্য থাকতে বাধ্য হন। এই রাজ্যে কাজ কোথায়! মায়ের কাছে থাকে দশ বছরের একরত্তি তামান্না।
'তাঁদের একাধিক সন্তান হয়েছিল। কিন্তু কেউই বাঁচেনি। ফলে ছোট্ট মেয়েটাই ছিল তাঁদের প্রাণভোমরা।'
তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে। মা চিন্তা-ভাবনা করে তামান্নাকে স্কুলে যেতে দেননি। হারলেও অশান্তি, জিতলেও যে শান্তি নেই। পশ্চিমবঙ্গে বোমা তৈরির শিল্প আজ এক বড়ো শিল্প - জিতলে বোমা, হারলে বোমা। চপ শিল্পের মতোই বোমা শিল্প হল পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ।
তামান্না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয় মিছিল দেখছিল। তবে তার বাবা নাকি সিপিএম সমর্থক। এই অজুহাতে মিছিল থেকে বোমা ছুঁড়ে দিল ছোট্ট মানুষটির দিকে।
মা-বাপের প্রাণভোমরা চলে গেল। একেবারে অকারণে - স্রেফ বোমা ফেলার জন্য হাত নিশপিশ করার জন্য। বিরোধী শক্তিকে এই বাংলা থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য একটা না ফোটা ফুলের মৃত্যু হল।
উপনির্বাচনে তৃণমূল জিতবে, সবার জানা ছিল। তবুও বোমা তৈরি হয়েছে - বিজয় মিছিলে তৃণমূল কর্মীরা গেছে বোমা নিয়ে। সেই বোমার আঘাতে তামান্না খাতুন চলে গেল। মা বাপের প্রাণভোমরা, একেবারে শৈশবে, অতি অকারণে, পৃথিবী থেকে বিদায় নিল।
এখন এই যে এক সবুজ প্রাণ পশ্চিমবঙ্গের বোমা শিল্পের উত্থানে অকাল বিদায় নিল, তার দায় কার!
দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস, পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, পুলিশ মন্ত্রী - প্রধান দায় রাষ্ট্রের। কিন্তু সেই ২০১১ সালের পর থেকে বাম পরিবারগুলিতে রাষ্ট্রের সহায়তায় যে মৃত্যু মিছিল চলেছে ছোট্ট তামান্না তো তার প্রথম 'উৎসর্গ' নয় - আমরা জানি শেষও নয়। তৃণমূল কংগ্রেস যতদিন রাজ্যপাটে আছে, ততদিন এভাবেই চলবে।
● ২০১৩ সালের বহু প্রতিভাসম্পন্ন ছাত্র কর্মী সুদীপ্ত গুপ্ত মারা যায় পুলিশ প্রহৃত হয়ে।
● ২০১৮ সাল। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের কয়েক ঘন্টা আগে এক সিপি(আই)এম কর্মী এবং তাঁর স্ত্রীকে তাঁদের বাড়িতে আটকে রেখে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। নামখানার দেবু দাস এবং ঊষা দাসকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থকরা হত্যা করেছে।
● ২০২১ সালে পুলিশের মারে মারা যায় চাকরির দাবিতে শহরে আসা যুব ফেডারেশনের কর্মী মঈদুল মিদ্দা। "আমি বাঁচবুনি" মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে বলেছিলেন মঈদুল। পুলিশের লাঠির আঘাত লেগেছিল তাঁর কিডনিতে, সে ধাক্কা তিনি আর সামলাতে পারেননি। আর মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, কিডনির কোনো সমস্যা ছিল কি না খতিয়ে দেখছে পুলিশ। দেখা কি শেষ হয়েছে? তদন্ত?
● বাগনান কলেজে পড়ার সময় আনিস খান এসএফআই করতেন। ২০২২ সালে আমতার ছাত্রনেতা আনিস খানের মৃত্যু কীভাবে হল? সেই রাতে পুলিশ কেন গিয়েছিল ওই ছাত্রের বাড়িতে? এইসব প্রশ্ন তুলে রাস্তায় নেমেছেন বহু মানুষ। পুলিশ কি শাস্তি পেয়েছে?
● ওয়াকফ আইন পাল্টাতে প্রস্তুতি নিল কেন্দ্রীয় সরকার। তা নিয়ে তৃণমূল কর্মীদের হিংসায় মুর্শিদাবাদে প্রাণ হারালেন এই সেদিন, এই বছরের এপ্রিল মাসে, সিপি(আই)এম কর্মী হরগোবিন্দ দাস এবং তাঁর ছেলে চন্দন দাস।
এই রাজ্যে পুলিশ ও সরকারি দলের নেক্সাস প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন নষ্ট করতে সচেষ্ট। পুলিশ শুধু ক্ষমতাহীন পুতুলে পরিণত হয়নি, তারা সত্তরের দশকের নব কংগ্রেসের জামানার মতো পাড়ার তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সরকারি পরামর্শদাতারা অর্থলুব্ধ। বুদ্ধিজীবী প্রাইজলুব্ধ।
সবাইকে কেনা যায়। প্রাইজ, অর্থ, পদ - আজ শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে কেনা যায়। সহজেই।
সবাইকে কি কেনা যায়?
১০ বছরের পুতুলের মতো ছোট্টো তামান্নাকে খুন করার পরে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন পুলিশ অফিসার, ডেবরা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য, বিধায়ক হুমায়ুন কবির মৃত সন্তানের মা'কে ২০ লক্ষ টাকা অর্থমূল্য ধরে দিতে গিয়ে প্রশ্ন শুনলেন, কেন এই টাকা দেবার চেষ্টা হচ্ছে!
কেন!
মৃত্যু মিছিল চলেছে। মোট কতজন বামপন্থী কর্মী মারা গেছেন জানা নেই। তবে এই মিছিলের বৃহদাংশ রয়েছেন গ্রামে। আর এই মৃতদের মধ্যেও শতাংশের হিসেবে এখনও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দরিদ্রতম মানুষ লাইন দিয়ে আছেন। তারা আছেন আমাদের লোকচক্ষুর অন্তরালে। আমাদের আলোচনার বাইরে।
তারা কি আমাদের হৃদয়ে নেই, তাদের কি আমরা হারিয়ে যেতে দেব!
১৯৪৯ সালে মধ্য যৌবনে পুলিশের গুলিতে নিহত চার নারী ও এক পুরুষকে তো আমরা ভুলে যাইনি। ভুলতে দিইনি।
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে তখনই শহীদরা জেগে থাকেন যদি তাঁদের জাগিয়ে রাখার জন্য বাম নেতৃত্ব ও কর্মীরা সচেষ্ট হন। একটা সময় ছিল যখন বামপন্থী নেতা কর্মী সমর্থকরা কিছু হলে রাস্তায় নামতেন। নিয়মিত মিছিল, মিটিং, পথসভা হতো; প্রতিবাদ ও আন্দোলন চলত। ফেসবুকে যতই পোস্ট চলুক তাতে সুদীপ্ত, মঈদুল, আনিস বা তামান্নারা বেঁচে থাকবেন না সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। আবার বোমা পড়বে, পুলিশ পেটাবে, আবারও মরবে বাম পরিবারগুলির তরুণ সদস্যরা।
এই রাজ্যে, অংকের বিচারে, প্রধান বিরোধী শক্তি বসে আছে যাতে বাম শক্তি কখনো মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, এই রাজ্যের এবং কেন্দ্রীয় সরকারি দলের - দুই পক্ষেরই মূল শত্রু বামেরা।
এদের ভেতরে গুজুর ফুসুর, বাইরে কাটুস কুটুস।
সিবিআই, ইডি, সিআইডি - কেউ সাধারণের পাশে বিশ্বস্ত নয়।
একমাত্র অবিরাম, ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে পারে। আর সেই আন্দোলন করতে হবে বামেদেরই। এছাড়া বামপন্থা বাঁচতে পারে না।
ভয় হয় - তামান্নাদের হারালাম, বামপন্থাকে এই রাজ্যে বাঁচিয়ে রাখা যাবে তো?