আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২

প্রবন্ধ

জটিল-বিরল রোগে আক্রান্ত শিশু-কিশোর

সুগত ত্রিপাঠী


বিশ্বজুড়ে অসংখ্য শিশু, কিশোর-কিশোরী নানা ধরনের জটিল এবং বিরল রোগে আক্রান্ত। রোগের কোনও কোনও-টি দুঃসাধ্য, কোনও-টি অসাধ্য। জটিল স্নায়ুরোগ, অস্থি-সংক্রান্ত অসুখ, টাইপ-১ ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্রের গুরুতর ত্রুটি, রক্তের অসুখ - এরকমই কয়েকটি। সেইসঙ্গে কিছু বিরল জিনঘটিত রোগের নামও করতে হয়। যেমন - গ্লাইকোজেন স্টোরেজ ডিসঅর্ডার, মিথাইলমেলনিক অ্যাসিডিমিয়া, বোন ম্যারো ফেলিওর সিনড্রোম, স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি, বেয়ার লিম্ফোসাইট সিনড্রোম, ক্র্যাব ডিজিস, ফেনোকেটনুরিয়া (পি.কে.ইউ.) ইত্যাদি। এসব রোগের অধিকাংশের চিকিৎসা ব্যয়বহুল, কোনও কোনও-টি অতি ব্যয়বহুল - কোটি কোটি টাকার ব্যাপার। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারে এ জাতীয় রোগ নিয়ে যখন শিশুরা জন্মায়, কিংবা জন্মের কয়েক মাস, কয়েক বছর পরে রোগাক্রান্ত হয়, সে সব বাড়িতে দুশ্চিন্তার সীমা-পরিসীমা থাকে না। রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে, খরচের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে সংসার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আরও পরিহাস - যে সব রোগ আর সারবে না বলে চিকিৎসক জানিয়েই দিয়েছেন, তার পেছনেও অকাতরে অর্থব্যয় করে যেতে হয় রোগীকে যথাসম্ভব স্বস্তি দেওয়ার জন্য। চোখের সামনে বাচ্চার যন্ত্রণা তো দেখা যায় না। বাবা-মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য যে ভেঙেচুরে কোন পর্যায়ে যায় এসব ক্ষেত্রে, সে প্রসঙ্গ না তোলাই ভালো। মাঝে মাঝেই সংবাদপত্রের পাতায়, সমাজমাধ্যমে এ জাতীয় খবর গোচরে আসে।

তবু, বহু মানুষের মধ্যে এখনও শুভবুদ্ধি আছে। বহু মানুষ সাহায্য করার জন্য সমাজমাধ্যমেই আবেদন রাখেন। তাঁরা শুধু শ্রদ্ধেয় নন, প্রণম্য। যুবা থেকে বৃদ্ধ - নানান বয়সী মানুষ বলেন - "কন্ট্যাক্ট নাম্বার দিন। আমি সাধ্যমতো সাহায্য করব", অথবা "এই শিশুটির প্রতিমাসের খরচের এক-চতুর্থাংশ দিতে আমি রাজি আছি।" আপ্লুত হয়ে যেতে হয় এ জাতীয় খবর পড়ে। অনেক যুবক সংঘবদ্ধভাবে পাড়ার কোনও দুঃস্থ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে তাঁদের একমাত্র সন্তানের ব্লাড-ক্যান্সার কিংবা স্কোলিওসিস-এর চিকিৎসার জন্য - এ সংবাদও দেখতে পাই।

অর্থাৎ এঁরা কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে, কোথাও আবেদন করে তীর্থের কাকের মতো দিনের পর দিন অর্থসাহায্যের আশায় বসে না থেকে নিজেদের উদ্যোগে যথাসাধ্য করছেন। অতীব প্রশংসনীয় এঁদের এই প্রয়াস।

কিন্তু এভাবে কতজনকে সাহায্য করা যায়? কতজনের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব? দেশ তথা সমগ্র বিশ্বে এ জাতীয় রোগাক্রান্ত শিশু-কিশোরের সংখ্যা অগুনতি। অতএব এদের জন্য দেশের সরকারকে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হতে হবে। হ্যাঁ, আন্তরিকভাবে। দেশ তথা আমাদের রাজ্যে এসব রোগের চিকিৎসা অনেক কম খরচে করার কিছু ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তার সুযোগ ক'জন পায়? সেই সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালাতে গিয়ে যেন একটি পরিবারও পথে না বসে, সেটা দেখতে হবে। কারণ, এ ঘটনা খুবই বাস্তব যে - চিকিৎসার খরচ সংগ্রহ করতে গিয়ে জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ি-সোনাদানা অনেকে বেচে দিতে বা বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই সে বন্ধকী বস্তু আর উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।

আরও ভয়াবহ সব চিত্র আছে। করুণ পরিস্থিতি আছে। এইসব অসুস্থ বাচ্চাদের অনেকেই পিতৃহীন অথবা মাতৃহীন, অথবা পিতৃ-মাতৃহীন। কারও বাবা থেকেও নেই। অসুস্থ সন্তান-সহ স্ত্রীকে ফেলে পালিয়েছে দায়িত্ব এড়ানোর জন্য। এদের পরিস্থিতি অধিকতর মর্মন্তুদ। অনেকে স্রেফ চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

এইসব শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা চিকিৎসালয় তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে অতি স্বল্পমূল্যে কিংবা বিনামূল্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে দরকার, এই জাতীয় রোগ যাতে বাচ্চাদের না হয়, সে দিকটা দেখা। কারণ, অনেক নারী-পুরুষের কৃতকর্মের ফলে অনেক সময় রোগাক্রান্ত শিশুর জন্ম হয়। নিষিদ্ধ আত্মীয়-স্বজন সম্পর্কে বিবাহ কোনও কোনও সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত আছে। জিনঘটিত বিভিন্ন জটিল অসুখের এটা একটা বড় কারণ। এমন কিছু রোগ আছে যেগুলি বাবা-মায়ের থাকলে সন্তানের ভেতরে আসার প্রবল সম্ভাবনা। যেমন - এইডস। সেইসব দম্পতি সন্তান-গ্রহণের আগে যেন গভীরভাবে চিন্তা করেন, এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্ভব হলে যেন সন্তানের জন্ম দেওয়ার ইচ্ছা থেকে বিরত থাকেন। কারণ এই জাতীয় অসুস্থ সন্তান সমাজে ভালোর চেয়ে সম্ভবত মন্দই বেশি করবে। রোগটা পরিব্যপ্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। কামজ উত্তেজনা, সামাজিকতার দোহাই, পারিবারিক চাপ প্রভৃতি নানাবিধ কারণে রোগাক্রান্ত দম্পতি সন্তানের জন্ম দেন বা দিতে বাধ্য হন। এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। রোগাক্রান্ত সন্তান জন্ম দেওয়ার চেয়ে নিঃসন্তান থাকা অনেক শ্রেয় - এটা বুঝতে হবে। বিশ্বের বহু মান্যগণ্য ব্যক্তি আছেন নিঃসন্তান। অনেকে ইচ্ছে করেই সন্তানের পিতা-মাতা হননি, আবার অনেকের সন্তানাদি হয়নি। এঁরা প্রেরণা হতে পারেন এইসব নিঃসন্তান দম্পতির। এমনকি বহু রোগাক্রান্ত মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে অবিবাহিত থেকে যান। এগুলি অনুধাবনের বিষয়।

বাল্যবিবাহ এখন আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু লুকিয়ে-চুরিয়ে এরকম অজস্র বিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। সন্তানধারণের উপযুক্ত বয়সের পূর্বেই যদি নারী সন্তানের জন্ম দেন, সেক্ষেত্রে মা এবং সন্তান উভয়েরই স্বাস্থ্যহানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব ক্ষেত্রে বহু সময়ে সন্তান শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

প্রবন্ধে সমাজমাধ্যম-প্রসঙ্গ এনেছি। সে বিষয়ে আর কিছু কথা। কিছু ছবি ব্যতিক্রমী। অতি কঠিন রোগে আক্রান্ত কোনও শিশুর পিতা-মাতাকে দেখা যায় তাঁর সন্তানটিকে সুস্থ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে, এবং সেই চেষ্টার ভিডিও হাসিমুখে সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করতে। 'হাসিমুখে' শব্দটি এখানে লক্ষ্যণীয়। হয়তো মনে অশেষ দুঃখ রয়েছে, সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু তার বাহ্যিক প্রকাশ না ঘটিয়ে; লোকের কাছে করুণার পাত্র না হয়ে, করুণা ভিক্ষা না করে এঁরা দিনের পর দিন ছেলেকে ব্যায়াম করানোর, হাঁটানোর, খাওয়ানো-পরানোর ছবি প্রকাশ করে চলেন। সেইসঙ্গে দূর-দূরান্তের চিকিৎসালয়ে সন্তানকে নিয়ে যাওয়ার ছবিও পোস্ট করেন। হয়তো এতে এঁদের মনটা হালকা হয়, বহু মানুষের শুভকামনায় তাঁর সন্তান হয়তো একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে, এরকমটাও তাঁরা ভাবতে পারেন। এর আর একটা সুবিধা হল এই, সমগোত্রীয় মানুষকে অনেক সময় তাঁরা কাছে পান। অন্যান্য বাবা-মায়েরা, যাঁরা তাঁদের সন্তানকে নিয়ে একই সমস্যায় জর্জরিত, পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের একটা রাস্তা খুঁজে পান। মনে সাহস পান লড়াই করার। চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়েও পরস্পর মতবিনিময় করতে পারেন। ফলে উভয়পক্ষই উপকৃত হন।