আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২

প্রবন্ধ

শম্ভাজীর জীবন ও মৃত্যুঃ ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের চোখে

রঞ্জন রায়


ভূমিকা

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থেমেছে। সবচেয়ে ভালো খবর, এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে কোথাও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি - কিন্তু ঘৃণার চাষ হচ্ছে।

ইতিহাসকে বিকৃত করে শিবাজীর পুত্র শম্ভাজীকে নায়ক করে 'ছাভা' বলে একটা সিনেমা কিছুদিন আগে হলে রিলীজ হয়ে রেকর্ড সংখক আয় করেছে। সেখানে দেখানো হয়েছে ছাভা বা শম্ভাজীকে সারারাত ধরে অকথ্য অত্যাচার করে বারবার বলা হল ইসলাম কবুল করতে - শম্ভাজী নিজধর্মে অটল এবং শহীদ। দর্শক হল থেকে বেরিয়ে আসছে চোখে জল, বুকে ঘৃণা নিয়ে।

শম্ভাজী কি হিন্দুধর্মের জন্যে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? মোগল সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিল্লিতে হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপন করতে চেয়েছিলেন? আমরা গত শতাব্দীতে লেখা যদুনাথ সরকারের দুটো বই, 'শিবাজী অ্যান্ড হিজ টাইমস্‌' (১৯১৯) এবং 'হাউস অফ শিবাজী' (১৯৪০) থেকে দেখব যে শম্ভাজীকে নৃশংস শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়ার পেছনে ঠিক কি উদ্দেশ্য ছিল - ধর্মান্তরণের জন্য চাপ? নাকি অন্য কিছু? যদুনাথ কী বলেন?

শম্ভাজীর মোগল শিবিরে যোগদান

"শিবাজীর জ্যেষ্ঠপুত্র শম্ভাজী হলেন তাঁর প্রৌঢ় বয়সের অভিশাপ। তিরিশ বছরের যুবকটি হিংস্র, লোভী, অস্থিরমতি, নির্বুদ্ধি এবং তার মধ্যে নৈতিকতার ছিঁটেফোঁটাও নেই। এক বিবাহিত ব্রাহ্মণ যুবতীর সঙ্গে বলাৎকারের দোষে শিবাজী তাকে পানহালা দুর্গে আটকে রাখেন। কিন্তু সে তার পত্নী যেসুবাঈ এবং কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে দিলীর খাঁয়ের সঙ্গে যোগ দেয়।" (শিবাজী অ্যান্ড হিজ টাইমস্‌, পৃঃ ৩৮০)

শম্ভাজী তার পিতার বিরুদ্ধে মোঘল সেনাপতির সঙ্গে যোগ দিতে চান - এই মর্মে দিলীর খাঁ-কে পত্র পাঠিয়েছিলেন। দিলীর নিজে কিছু সৈন্য নিয়ে শম্ভাজীকে সুরক্ষা দিয়ে নিজের কেল্লায় নিয়ে আসেন। (শিবাজী অ্যান্ড হিজ টাইমস্‌, পৃঃ ৩৬২)

দিলীর চিঠি লিখে সম্রাট ঔরংজেবকে এই সংবাদ জানিয়ে দিলে শম্ভাজীকে সাতহাজারী মনসবদার করা হয় এবং একটি হাতি উপঢৌকন দেওয়া হয় (নভেম্বর, ১৬৭৮)। তারপর দিলীর খাঁ এবং শম্ভাজী বিজাপুরের সুলতানকে আক্রমণের তোড়জোড় শুরু করেন। কিন্তু সে প্রয়াস ব্যর্থ হয়।

এপ্রিল ১৬৭৯ নাগাদ শম্ভাজীর সহযোগিতায় দিলীর খাঁ-র ফৌজ ভুপালগড় অধিকার করে। সেখানে শিবাজী বহু বছর ধরে তাঁর সম্পদ এবং ধনরত্ন সঞ্চিত করে রেখেছিলেন। দিলীর খাঁ লুটতরাজের পর ভুপালগড়ের কিলা ধ্বংস করে। দিলীর খাঁ এবং শম্ভাজীর সম্মিলিত ফৌজ ১৪ নভেম্বর, ১৬৭৯ তারিখে শিবাজীর মিরাজ-পানহালা দুর্গ আক্রমণের অভিলাষে এগিয়ে যান। শম্ভাজী গর্ব করে বলছিলেন, তিনি সহজেই তাঁর নিজস্ব মারাঠা অনুগামীদের নিয়ে পানহালা দুর্গ অধিকার করতে পারবেন। তাতে মুঘল সাম্রাজ্যের এই এলাকায় বিস্তার সহজ হবে, আর মিরাজের ছোটোছোটো সেনানায়কদের এক মোগল এজেন্ট ইতিমধ্যেই কিনে নিয়েছে। (ঐ, পৃঃ ৩৭৩)

কিন্তু এই বাহিনী প্রথমে বিজাপুর সংলগ্ন এলাকায় নৃশংস অত্যাচার এবং লুটপাট ও ধংসলীলা চালায়। তারপর ওরা টিকোটা নামক সমৃদ্ধ জনপদে পৌঁছে গেলে হিন্দু তথা মুসলিম পরিবারের মেয়েরা তাদের বাচ্চাকে নিয়ে নিজেদের আঙিনার কুয়োর মধ্যে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করল। সম্পূর্ণ গ্রাম বিধ্বস্ত হল। হিন্দু এবং মুসলিম মিলিয়ে প্রায় ৩,০০০ পুরুষকে বন্দী করে দাস বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হল।

নভেম্বর, ১৬৭৮ নাগাদ শম্ভাজী মোঘল বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তখন থেকেই শিবাজীর চরেরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করছিল এবং গোপনে নানাভাবে বোঝাচ্ছিল যে তিনি কাজটা ঠিক করেননি। মারাঠা দলে (শিবাজীর সঙ্গে) ফিরে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত। শম্ভাজী ২০ নভেম্বর, ১৬৭৯ নাগাদ তার স্ত্রী এবং দশজন অনুচরকে নিয়ে গোপনে সেখান থেকে পালিয়ে শিবাজীর শরণে পানহালা দুর্গে আশ্রয় নিলেন। (শিবাজী অ্যান্ড হিজ টাইমস্‌, পৃঃ ৩৭৫)

এইভাবে শম্ভাজীর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং মুঘল বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এক বছর ব্যাপী অধ্যায় শেষ হল।

২ ডিসেম্বর, ১৬৭৯ শম্ভাজী পানহালা দুর্গে শিবাজীর সঙ্গে মিলিত হলে তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বিশাল মারাঠা বাহিনী খান্দেশ, বেরার এবং বালাঘাট অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়ালো ও বণিকদের লুঠে নিল। তারপর ৬ ডিসেম্বর, ১৬৭৯ ঔরঙ্গাবাদের কাছে জালনায় পৌঁছাল। সেখানে একজন বিখ্যাত সুফী সন্ত ছিলেন - সৈয়দ জান মহম্মদ। শিবাজী কোনো ধর্মের সন্তদের আশ্রমে হামলা পছন্দ করতেন না। কিন্তু মারাঠা ফৌজের অগ্রণী বাহিনীটি সুফীর আশ্রমে হামলা করে, ওঁনাকে আহত করে।

শিবাজী এই ঘটনার পাঁচ মাসের মধ্যে মারা যান।

শিবাজীর মৃত্যু এবং শম্ভাজীর ক্ষমতা লাভ

৫ এপ্রিল, ১৬৮০। জ্বর এবং রক্ত আমাশায় বারোদিন ভুগে শিবাজী প্রাণত্যাগ করলেন। মৃত্যুর একটা সম্ভাব্য কারণ - দ্বিতীয় পত্নী সয়াবাঈ বিষ দিয়েছিলেন যাতে শম্ভাজী নয়, রাজারাম সিংহাসনে বসেন। শম্ভাজী ক্ষমতা লাভের পর সয়াবাঈকে উপরোক্ত অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন। আচার্য যদুনাথের মতে, ওটা অজুহাত, পথের কাঁটা সরানোই আসল উদ্দেশ্য। (শিবাজী অ্যান্ড হিজ টাইমস্‌ পৃঃ ৩৬২, পৃঃ ৩৮৩)

২৭ এপ্রিল, ১৬৮০। শম্ভাজী পানহালা দুর্গে বসে নিজেকে মারাঠা সাম্রাজ্যের 'রাজা' ঘোষণা করে পিতার সমস্ত সুবেদার হাবিলদারদের ডেকে পাঠালেন। মোরো পণ্ডিত এবং আন্নাজী পণ্ডিত তাদের অগ্রগণ্য।

৩০ জুন, ১৬৮০। আন্নাজী পণ্ডিত বন্দী, শেকলে বাঁধা। মোরো পণ্ডিত তাঁর পছন্দ, কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস অর্জন করেননি। কিছু সুবেদার/হাবিলদার বরখাস্ত, কিছু বন্দী। ৫,০০০ বিশ্বস্ত সৈনিক দুর্গে রয়েছে - মারাঠা সাম্রাজ্য কিঞ্চিত শান্ত, সুস্থির।

নভেম্বর, ১৬৮০। শম্ভাজীর অভিযান তিন দিশায় চলছে। সুরাত এবং বুরহানপুরের দিকে এগোচ্ছে অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈন্যের দল। ওদিকে একটা দল দাক্ষিণাত্যের মুঘল সুবেদার বাহাদুর খানকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ একটি দল শম্ভাজীর চিঠি নিয়ে বোম্বে হাজির। অভিযোগ ইংরেজ কুঠিয়ালরা সিদ্দির সুলতানকে আশ্রয় দিয়েছেন।

শিবাজীর সেনাধ্যক্ষেরা বেশির ভাগই ব্রাহ্মণ। তাঁরা শম্ভাজীকে পছন্দ করেন না। চতুর শম্ভাজী তাঁদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে রাজা হলেন - কিন্তু সবাই ভীত। কারণ, খবর এসেছে, তিনি শিবাজীর সময়ের কিছু খ্যাতনামা ব্রাহ্মণ সেনাপতিকে বন্দী করেছেন। (দ্য হাউস অফ শিবাজী, পৃঃ ১৯৭)

২১ জুন, ১৬৮১। ঔরঙ্গজেবের চতুর্থ সন্তান শাহজাদা আকবর রাণা রাজসিংহকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় পিতার রোষভাজন হয়ে দুর্গাদাস রাঠোরের সঙ্গে পালির কাছে আশ্রয় নেন। তিনি শম্ভাজীকে নিয়মিত চিঠি লেখেন - ঔরঙ্গজেব কট্টর মুসলিম, এবং হিন্দু বিরোধী। সেনাপতি জয় সিংহের মৃত্যুর পর হিন্দুদের উপর অত্যাচার আরও বেড়েছে। আপনি ও আমি হাত মিলিয়ে সম্রাটকে হারিয়ে দিয়ে সাম্রাজ্যে শান্তি ও সুশাসন আনতে চাই। আমি দিল্লির মসনদে বসলে আপনাকে যথেষ্ট সম্মান ও ক্ষমতা প্রদান করব।

৩০ অগাস্ট, ১৬৮১। কয়েকজন ব্রাহ্মণ সামন্তের ষড়যন্ত্রে শম্ভাজীর প্রাণ যেতে বসেছিল। মাছের পদে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়। সন্দেহ হওয়ায় একটি কুকুর এবং ভৃত্যকে খেতে দিলে দুজনেই দু'এক ঘন্টার মধ্যে মারা যায়। এই চক্রান্তে সামিল ছিলেন আন্নাজী পণ্ডিত এবং হীরাজী ফর্জান্দ। তাঁরা শাহজাদা আকবরকে সাম্রাজ্য সঁপে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু তিনি ওই চক্রান্তের কথা গোপনে দূত পাঠিয়ে শম্ভাজীকে জানিয়ে দেন। শম্ভাজী খুশি হয়ে তাঁকে ৩০,০০০ ঘোড়া উপহার দিলেন এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মোগল সাম্রাজ্যের সুবেদারের বিরুদ্ধে বুরহানপুরে লড়তে যাবার কথা দিলেন। (ঐ, পৃঃ ২০১) শম্ভাজী ওই চক্রান্তের জন্য আন্নাজী পণ্ডিত, হীরাজী ফর্জন্দ, বালাজী প্রভু এবং আরও পাঁচজনকে হাতির পায়ের তলায় পিষে মারার শাস্তি দিলেন। আরও কুড়ি জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল।

১৩ নভেম্বর, ১৬৮১। শম্ভাজী শাহজাদা আকবরের সঙ্গে দেখা করলেন।

ডিসেম্বর, ১৬৮১। শম্ভাজীর ব্রাহ্মণদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অব্যাহত। শোনা যায়, সন্ধ্যেবেলা মদের নেশা মাথায় চড়লে তাঁর ব্রাহ্মণদের প্রতি তীব্র রাগ বেড়ে যেত আর তখন মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিতেন। তিনি নাকি টের পেয়েছিলেন, শিবাজীর ব্রাহ্মণ সেনাপতিরা তাঁকে সরিয়ে সৎভাই রাজারামকে কারাগার থেকে বের করে ক্ষমতায় বসাতে চায়। (ঐ, পৃঃ ২০২)

শম্ভাজীর পতন

৪ ফেব্রুয়ারি, ১৬৮২। নবাব হাসান আলি খাঁয়ের নেতৃত্বে বিশাল মোগল বাহিনী আকবর ও শম্ভাজীকে পরাস্ত করল। তাঁরা পিছিয়ে গিয়ে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে আশ্রয় নিলেন। মোগল বাহিনী শম্ভাজীর অঞ্চল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এগিয়ে চলল।

নভেম্বর, ১৬৮৩। শম্ভাজী গোয়া তছনছ করলেও পর্তুগীজদের হারাতে পারেননি। প্রথমে আকবর গিয়ে পর্তুগীজদের সঙ্গে দেখা করলেন। দু'মাস পরে শম্ভাজী দুর্গাদাস রাঠোরকে তাঁর দূত করে পর্তুগিজদের কাছে শান্তিবার্তা পাঠালেন। (হাউস অফ শিবাজী, পৃঃ ২০৫)

৬ নভেম্বর, ১৯৮৪। শম্ভাজীর রাজত্বে ইউরোপীয় বণিকেরা ব্যবসা করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, কর আদায় ছাড়াও 'পেশকশ' (নজরানা বা ঘুষ) রাজা থেকে শুরু করে ছোটো পেয়াদা পর্যন্ত সবাইকে দরকার মতো দিতে হয়। (কারওয়ার কুঠির সুরাত কাউন্সিলকে লেখা চিঠি, পৃঃ ২০৬)

শম্ভাজীর মৃত্যু

শম্ভাজীর ব্রাহ্মণদের প্রতি অবিরাম নৃশংসতা অনেক সেনাপতিকে বিমুখ করল। তাঁরা ষড়যন্ত্র করে বিফল হলেন এবং তাঁদের বধ করা হল। এদিকে বিপর্যস্ত মারাঠি ব্রাহ্মণ সেনাপতিরা হতাশ হয়ে শেষে মোগল সম্রাটের সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্রে যোগ দিলেন। কথা হল শম্ভাজীকে শিকারের লোভ দেখিয়ে দুর্গম স্থানে নিয়ে মোগল সৈন্যের পাতা ফাঁদে বন্দী করতে হবে। মুগল সেনাপতি মুকারব খান বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেলেন যে শম্ভাজী সঙ্গমেশ্বর গেছেন। তাঁর বন্ধু এবং সেনাপতি কবি কলশ বিশাল প্রাসাদ, প্রমোদ উদ্যান ইত্যাদি বানিয়েছেন। সেখানে এখন শম্ভাজী আনন্দ উপভোগে ব্যস্ত। মুকারব খান অল্প কয়েকজন বিশ্বস্ত যোদ্ধা নিয়ে ৪৫ ক্রোশ দূরের কোলহাপুর থেকে রওনা হলেন। বড় রাস্তা ছেড়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে গোপনে পৌঁছে গেলেন সঙ্গমেশ্বর।

শম্ভাজীর চরেরা খবর আনল - মোগল সৈন্যের দল এসে পড়েছে! কিন্তু প্রমোদে ব্যস্ত শম্ভাজীর তখন হুঁস নেই। দাম্ভিক শম্ভাজী চেঁচিয়ে উঠলেন - মূর্খ, অকর্মণের দল! এখানে মোগলেরা কী করে আসতে পারে! ইশারায় তাদের কোতল করার হুকুম দিলেন। (দ্য হাউস অফ শিবাজী, পৃঃ ২০৮)। খান তাঁর কয়েকশ অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। চার-পাঁচ হাজার বর্শাধারী মারাঠা সৈনিকেরা প্রতিরোধ করল। কিন্তু সেনাপতি কবি কলশ আচমকা এক তিরের ঘায়ে আহত হওয়ায় সৈন্যেরা পালিয়ে গেল।

শম্ভাজী প্রাসাদের একটি তলঘরে লুকিয়ে রইলেন; কিন্তু গুপ্তচরেরা গোপন আস্তানার খবর ফাঁস করে দিল। ইখলাশ খান তলঘরে হানা দিয়ে শম্ভাজীকে বন্দী করে মুকারমের কাছে নিয়ে গেলেন। শম্ভাজীর পঁচিশ জন অনুচর সপরিবারে বন্দী হল। শম্ভাজী অল্প সময়ে চুল ছোটো করে ছেঁটে গায়ে ছাই মেখে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে পালাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু গলার মুক্তোর মালার জন্যে ধরা পড়ে যান। (পৃঃ ২১৪) ঔরঙ্গজেব তখন আকলুজে শিবির গেড়েছেন। তাঁর নির্দেশে বন্দীকে হাতে পায়ে শেকল পরিয়ে সাবধানে নিয়ে আসা হল। পথে কোনো ফৌজ শাম্ভাকে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করেনি।

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৬৮৯। ঔরঙ্গজেব বাহাদুরগড়ে শিবির ফেলেছেন। সেখানে দরবার বসল। সম্রাটের নির্দেশে শম্ভাজী ও তাঁর সঙ্গীদের ভাঁড়ের পোশাক পরিয়ে উটের পিঠে চড়িয়ে ঢেঁড়া পিটিয়ে শিঙা ফুঁকে শোভাযাত্রা করে আনা হল। উদ্দেশ্য তাঁদের সবার সামনে অপমানিত করা, এবং হিন্দুদের মনে ভয় সৃষ্টি করা। (পৃঃ ২০৯)

দু'দিন পরে সম্রাট রুহুল্লাহ খানকে বললন - শম্ভাজীর থেকে জেনে নাও সমস্ত ধনরত্ন, গয়নাগাঁটি এবং বহুমূল্য সম্পত্তি সব কোথায় রাখা আছে? আর আমার কোন কোন ওমরাহ্‌ ওর সঙ্গে চিঠি চালাচালি করছে। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে গর্বিত শম্ভাজী মাথা নোয়াননি, উলটে সম্রাটের উদ্দেশে তেড়ে গাল দিলেন। কেউ ভয়ে সেই শব্দগুলো সম্রাটকে বলতে সাহস করল না, শুধু বন্দীর ঔদ্ধত্য এবং অনমনীয় স্বভাবের কথা বলল। তখন সম্রাটের আদেশে শম্ভাজীর দুই চোখ গেলে দেওঞ্জঞ্জঞ্জশশশষশশশ্বশ্বয়া হল। কিন্তু তিনি মার্জনা ভিক্ষা করেননি, বরং সেদিন থেকে আহার করা বন্ধ করে দিলেন। প্রহরীদের শত অনুরোধেও কাজ হল না।

এই সংবাদ পাওয়ার পরে সম্রাট শম্ভাজীকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন। সেখানে তাঁর শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একটা একটা করে কেটে তারপরে শিরচ্ছেদ করা হল। সম্রাটের আদেশে শম্ভাজীর ছিন্নমুণ্ড ঔরঙ্গাবাদ থেকে বুরহানপুর পর্যন্ত জনসমক্ষে প্রদর্শন করার পর দিল্লির নগরের দ্বারে টাঙিয়ে রাখা হল। (পৃঃ ২১১)

উপসংহার

যদুনাথের শিবাজী সম্পর্কিত দুটো বই তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও শম্ভাজীকে ইসলাম কবুল না করায় অত্যাচার করা হয়েছিল এমন তথ্য পাওয়া গেল না। উলটে ফুটে উঠল দাম্ভিক, নৃশংস, বিলাসী এক যুবকের ছবি। তিনি ক্ষমতার লোভে অনায়াসে মোগল সেনাপতিদের অধীন হতে পারেন। মোগল সম্রাটের মনসবদার হয়ে পিতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারেন।