আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২
প্রবন্ধ
মানবজাতি না দানবজাতি?
সোনাঝুরি মৈত্র
বেশ কিছুদিন আগে এক হতভাগ্য ভালুকের কাহিনি পড়েছিলাম কোনো একটি ব্লগ-এ। জোই (Joey) একটি মাঝবয়সি, মিষ্টি 'গ্রিজলি বিয়ার' - দেখতে এক্কেবারে টেক্সটবুক ভালুক। কিন্তু জোই বেচারি অ্যালবিনো; শরীরে এক ফোঁটাও মেলানিন নেই। অতএব অভাগা গ্রিজলি পুরোটাই সাদা। জোইর সঙ্গে কথা বলা গেলে নিশ্চয়ই জানা যেত যে ভালুক সমাজে তাকে একঘরে থুড়ি একগুহায় করে দেওয়া হয়েছে। তার সাদা লোমে কাদা ছিটিয়ে বাকি বাদামি ভালুকেরা ঠাট্টা করে। এহেন গুরুতর অবস্থায় যদি অন্য আরেকটি অকালপক্ক প্রজাতি তার পাকা ধানে মই দিতে আসে, তবে কেমন লাগে বলুন তো? এই অকালপক্ক প্রজাতি আর কেউই নয়, আয়নার দিকে তাকালেই দেখা যায়, স্ব-স্বীকৃত সভ্য জাতি - মানবজাতি। হঠাৎ একদিন একদল বেরসিক বিজ্ঞানীর চোখে পরে জোই। বলা নেই কওয়া নেই, তাদের মনে হয় জোই নির্ঘাত 'পোলার বিয়ার'। ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গে জোইর গায়ে ঘুমের গুলি ছুঁড়ে তাকে সুমেরু নিয়ে গিয়ে উদ্ধার করার কাজে লেগে পড়া হল। জোইর আতঙ্কটা একবার ভাবুন তো! আপনি ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ দেখলেন নিজেকে গ্লেসিয়ারে ভাসতে! আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবে না? জোইর মনে তখন কী চলছিল কে জানে? সে বোধহয় ভেবেছে ভালুক সমাজ তাকে নির্বাসন দিল বুঝি। কিছুদিন পর নাকি আরেক দল বিজ্ঞানী জোইর আকার আয়তন দেখে বুঝতে পারে সে মোটেই 'পোলার বিয়ার' নয়, সে 'গ্রিজলি'। তারাও আবার উদ্ধারকার্যে লেগে পড়ে। ফের সেই ঘুমের বড়ি, ফের পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত সফর। এর কিছুদিন পর নাকি আরও একবার 'পোলার বিয়ার' সন্দেহে তাকে সুমেরু পাঠানো হয় এবং এই করে সে নাকি বারপাচেঁক গোটা দুনিয়া সফর করে ফেলেছে। সমাজ মাধ্যমে এই জোই 'সবচেয়ে দুর্ভাগা ভালুক' হিসেবে স্বীকৃতও হয়। ঘটনার সত্যতা একেবারেই যাচাই করা নেই। অনেক সাক্ষাৎকারে এটাও বলা হয়েছে যে এ মোটেই সত্যি ঘটনা নয়, এ রটনা। সে যাই হোক, এমন কাজ মানুষের পক্ষে করা মোটেই অসম্ভব নয় বৈকি।

আরও একটি মজার বিষয় বলি তবে। একটি থিওরেম আছে যার নাম, 'দি ইনফাইনাইট মাঙ্কি থিওরেম'। এই থিওরেম অনুযায়ী একটি বানর যদি টাইপরাইটারে অনন্তকাল ধরে এলোপাথাড়ি বোতাম টেপে, তবে সে একদিন শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট লিখে ফেলতে পারবে। থিওরেমটি প্রোবাবিলিটি থিওরির এক বিশিষ্ট উদাহরণ বটে, কিন্তু তাই বলে বাঁদরের ওপর একি অত্যাচার? আরেকদল গবেষক আবার দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন যে এই থিওরেম সত্যি হলেও কাল্পনিক। হ্যামলেট লিখতে বানরজাতির যা সময় লাগবে তা তাদের আয়ুর চেয়ে কেন, এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের আয়ুর চেয়েও নাকি বেশি। যাচাই করে দেখার জন্যে পশ্চিমী কিছু বিজ্ঞানীরা একদল বানরকে পাকড়াও করে তাদের দিয়ে কম্পিউটারে টাইপ পর্যন্ত করিয়েছেন। ফলস্বরূপ দেখা গেছে বানরদলের ইংরেজির 'S' অক্ষরটি ভারি পছন্দের।
অন্যান্য প্রজাতির ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর স্বভাব মানুষজাতির চিরকালেরই। আমরা যে শক্তিশালী বেশি, মেধাবী বেশি, সভ্য বেশি তা আমরা বারংবার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করে দিতে চাই - নাম দিই 'গবেষণা', 'উদ্ধার' কিংবা 'উন্নয়ন'। এই ক্ষমতা প্রদর্শনের চিরন্তন লোভ শুধুমাত্র যে বাকি প্রজাতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা কিন্তু নয়। বিচিত্র এই জাতি তাদের নিজেদের মধ্যেও এমন আচরণ প্রায়শই করে থাকে। এই ধরুন না কত এমন উদাহরণ আছে যেখানে কেবলমাত্র প্রচণ্ড প্রতিপত্তির জেরে কত লোকে কত ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ফেলে। কারা দোষী আমরা জানি, বুঝি, কিন্তু প্রমাণ করতে পারি না। যেন কোনো এক রাজনৈতিক হলোগ্রাম - দেখা যাচ্ছে কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। দিনের পর দিন হয়তো আন্দোলন, অনশন চলছে। কিন্তু তাতে কীই বা হবে? হাত পা তো গিনিপিগরাও ছোঁড়ে তাদের যখন গবেষণাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুদিন পরে তারাও মিইয়ে যায়। তবে ক্ষমতা প্রয়োগের মধ্যে একটা পাশবিক আনন্দ আছে বৈকি। সেটা হাজার হাজার লোকের চাকরি এক নিমেষে ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা হোক বা কোনো এক আদিবাসী গ্রামে উন্নয়নের নামে হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ক্ষমতা হোক কিংবা ছোটবেলায় ইস্কুলে রোগা হাড় জিরজিরে ছেলেটাকে তিন চারজন মিলে বেধড়ক পেটানোর ক্ষমতা হোক। 'করি কারণ করতে পারি' - এই যে চিন্তাধারাটা একটা গোটা শ্রেণির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধারাবাহিক ভাবে বয়ে আসছে তার উদাহরণ কিন্তু প্রচুর। বাঘা বাঘা ঘটনায় না গিয়ে যদি আমরা নিজেদের দৈনন্দিন ছকের মধ্যেই তাকাই, তাহলেই কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাব। ইস্কুলে কিছু গোমড়ামুখো দিদিমনি মাস্টারমশাইয়েরা ছিলেন যারা পইপই করে ক্লাসে বলে দিতেন যে অঙ্কটা তাদের পদ্ধতিতেই করতে হবে, অন্য পদ্ধতিতে করলে নম্বর পাওয়া যাবে না। নম্বর দেওয়া নেওয়া সবটাই তাদের হাতে। তাই অঙ্ক ঠিক হোক বা বেঠিক, পদ্ধতি তাদের মনের মতো না হলে নম্বর কেটে নেওয়াটাও তাদেরই হাতে। সে গিয়ে হাজার ধর্ণা দিলেও, পেন খাতায় আঁক কষে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তারা সেই নম্বর কাটবেনই। কাটবেন কেন? কারণ তারা কাটতে পারেন। ন'টা-ছটার চাকরি করা সদ্য কলেজ পাশ করা যুবকের ওপর পঞ্চাশোর্ধ বদমেজাজি বস অবলীলায় অত্যাধিক কাজের চাপ দেবে কারণ কর্পোরেট যাজকতন্ত্র অনুযায়ী সে দিতে পারে। দস্যি ছেলেটা কালীপুজোর দিন কুকুরের ল্যাজে কালিপটকা বাঁধবে, কারণ সে বাঁধতে পারে। এই কাজগুলো করার পেছনে কিন্তু কোনো যুক্তি খাটে না। করার ক্ষমতা আছে তাই করাই যায়।
ক্ষমতার হাতে হাত রেখে চলে 'নিয়ম'। নিয়ম জিনিসটা বেশ অদ্ভুত! কিছু ক্ষমতাশালী মানুষ একটা কাঠামো গড়ে দিয়ে গেছেন এবং সেই কাঠামো অনুযায়ী আমরা গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলেছি। নিয়মকে কখনও প্রশ্ন করতে নেই - সেটা নিয়মবিরুদ্ধ। সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেতে নেই কেন? কারণ এটাই নিয়ম। মৃতপ্রায় রুগীটিকে নিয়ে হাসপাতালের দোরগোড়ায় লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে কেন? কারণ এটাই নিয়ম। 'নিয়ম' বিষয়টা কিন্তু এক দুর্দান্ত অজুহাত। যুক্তি দিয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজের ব্যাখ্যা না করা গেলে তাকে স্রেফ 'নিয়ম' বলে চালিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। 'নিয়ম' বলে - স্কুলে কেঁদে ফেললে তুমি দুর্বল, অফিসে রাগ দেখালে তুমি অসভ্য, রাস্তায় চিৎকার করলে তুমি অস্থির। 'নিয়ম' বলে, মেয়েদের রাত্রে একা হাঁটতে নেই, 'নিয়ম' বলে, কথায় কথায় প্রশ্ন তুলতে নেই। এইতো সেদিন আবাসনের গেটের বাইরে বৃষ্টিতে একদল কুকুরছানা ভিজে কাঁপছিল। ইচ্ছে থাকলেও গেট খুলে দিতে পারিনি কারণ গেট খোলার নিয়ম নেই।
তাই ভাবি, বাংলা অভিধানে সবচেয়ে বিদ্রূপাত্মক শব্দ বুঝি 'মানবিকতা'। আত্মমগ্ন মানবজাতি শব্দটি কেমন নিজের নামে পেটেন্ট করে রেখেছে দেখুন না। মানবিকতা যেন একমাত্র মানুষেরই জন্মসূত্রে পাওয়া অধিকার - বাকি প্রাণিকুলের তাতে ভাগ বসানোর অধিকার নেই। অথচ চরম নির্মমতার সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছে 'পাশবিকতা'। কী এক নিপুণ কৌশলে যেন তারা হিংস্রতাকে পশুদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। পশুরাই বুঝি দিনরাত গুলি চালায়, দেশ দখল করে, ধোঁকা দেয়, ব্র্যান্ডেড স্যুট পরে ঘুষ খায়। এ এক চমৎকার ভাষাগত কৌশল - যেখানে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে অপরকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়ার প্রাচীন অভ্যাস রয়ে গেছে। মানুষ মারলে বলি আত্মরক্ষা, পশু কামড়ালে বলি নৃশংসতা। মানুষ প্রতারণা করলে বলি বুদ্ধিমত্তা, পশু ঘেউ ঘেউ করলে বলি হিংস্রতা। ভণ্ডামির কোন চরম সীমায় পৌঁছলে এভাবে ভাষাকেও দাসত্বে বাধা যায় কে জানে! হয়তো তখনই, যখন ন্যায়-অন্যায় হয়ে পড়ে আপেক্ষিক-ক্ষমতার নিরিখে সংজ্ঞায়িত। তখনই পশুরা হয়ে ওঠে প্রতীক - নির্বোধ, হিংস্র, বন্য। আর মানুষ? মানুষ হয়ে ওঠে বিচারক, ব্যাখ্যাকারী, বিধানদাতা। কোথায় থাকে অভিধানে লেখা সেই 'মানবিকতা' যখন পৃথিবীর কোনো এক যুদ্ধবিদ্ধস্ত প্রান্তে শিশুদের কান্না 'আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা'র অজুহাতে চাপা পড়ে যায়? মানবিকতার সংজ্ঞা তাই কোনো সার্বজনীন সত্য নয়, বরং এক শ্রেণির তৈরি করা সেই শ্রেণির সুবিধামতো পরিধেয় পোশাক। এতবার স্থানান্তরের কারণে হয়তো কাল্পনিক কিংবা বাস্তব জোইর শরীরে গুরুতর রোগ বাসা বেঁধেছে। হয়তো কম্পিউটারের বোতাম টিপে টিপে ক্ষয়ে গেছে বাঁদরটির আঙ্গুল। কিন্তু তাতে কী? মানবজাতি তো মহান হল। মানবজাতির মান বাড়ল। 'মানবিকতা'র সংজ্ঞায় হয়তো যোগ হল আরও নতুন কিছু শব্দ।
'ইনফাইনাইট মাঙ্কি থিওরেম'-এর সেই বানরটির মতো আমরাও কিন্তু প্রতিদিন নির্বিকারভাবে টাইপ করে চলেছি - নিয়ম, আইন, উন্নয়ন, সভ্যতা। আশা একটাই, থিওরেম অনুযায়ী আমরাও একদিন হয়তো এলোপাথাড়ি বোতাম টিপে 'মানবিকতা'র প্রকৃত সংজ্ঞাটি লিখে ফেলতে পারব। তবে তা লিখতে যেন অনন্তকাল না লেগে যায়।