আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ জুন, ২০২৫ ● ১-১৫ আষাঢ়, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
অ-নৈতিক শিক্ষা
পশ্চিমবাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় অরাজকতা বিরামহীন। ইতিমধ্যেই আদালতের নির্দেশে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি গিয়েছে। সরকার এবং পর্ষদ আদালতের নির্দেশে নতুন করে পরীক্ষা নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া নিয়েও ইতিমধ্যেই জটিলতা ও বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কৃতিত্ব অবশ্যই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর অনুপ্রাণিত মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। উভয়েই বিগত সুনাম বজায় রেখে যতদূর জটিলতা তৈরি করা যায় করেছে। হেতু, অবোধ্য নয় তবে সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে।
এসএসসি মামলার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট যেভাবে নিয়োগ বাতিল করল, এবং তার পরে রাজ্য সরকার ও পর্ষদ যেভাবে ধীরে ধীরে পুনঃপরীক্ষার কথা জানাল, প্রাথমিক দৃষ্টিতে তা আদালতের রায়কে মেনে নেওয়ার ভানমাত্র। ২০১৬ ও ২০১৮-র নিয়োগ দুর্নীতির দায়ে বহু শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী চাকরি হারালেও, সরকার পুনরায় পুরোনো তালিকার কিছু অংশকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। নতুন বিজ্ঞপ্তিতে পুরোনো পরীক্ষার্থীদের 'অগ্রাধিকার' দেওয়া হবে বলে যে যুক্তি, তা আবার আদালতকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, কারণ এই অগ্রাধিকার কীভাবে দেওয়া হবে তা নির্দিষ্ট নয়, এবং তা ন্যায়বিচারপরায়ণও নয়। উপরন্তু, যে পরীক্ষা আগেই বাতিল হয়েছে, সেই পরীক্ষার ভিত্তিতে কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা আদালতের রায়ের পরিপন্থী হবে। এই যুক্তির মধ্যে দিয়ে আদালতের নির্দেশ কার্যত অগ্রাহ্য করার পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। নিয়োগ যেহেতু কেবল চাকরি নয়, বরং এটি রাজ্যের প্রতিটি কোণায় জনশিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার সাংবিধানিক দায়িত্বের অন্যতম হাতিয়ার, সেই জায়গা থেকে এই অনিশ্চয়তা শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট একাধিকবার উল্লেখ করেছে যে, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক। আদালত পর্ষদকে সরাসরি প্রশ্ন করেছে, 'যে পরীক্ষা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, তার ফলাফলের ভিত্তিতে কীভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়?' অর্থাৎ, আদালতের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই পুরোনো তালিকাকে একটি পবিত্র সম্পদ বলে আগলে রাখা চলে না। এ পর্যবেক্ষণ শুধু নিয়োগ নয়, গণতান্ত্রিক নীতিচেতনার দিক থেকেও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
পর্ষদের এই গাফিলতিকে নিছক তাঁদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা দুর্বলতা বলে দায়সারা করলে মূল সত্য গোপন থেকে যায়। বাস্তবে, এই ভুল সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে শাসকদলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশ এবং সেই নির্দেশ পালন করার এক রকম বাধ্যবাধকতা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, “আগের পরীক্ষায় যারা বসেছিলেন এবং কৃতকার্য হয়েছেন, তাঁদের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নম্বর অ্যাডজাস্ট করে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।” এই ঘোষণা শুনে সহজেই বোঝা যায়, বিজ্ঞপ্তির খুঁটিনাটি এখনও স্থির না হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়ে গেছে। পরে দেখা যায়, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের জারি করা বিজ্ঞপ্তির কাঠামো প্রায় হুবহু মুখ্যমন্ত্রীর ওই ঘোষণার অনুসরণে গঠিত। এখানেই বিপদের সূচনা। নিয়োগের মতো সংবেদনশীল ও বিচারাধীন বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এইরকম একতরফা ঘোষণা, এবং তা মেনে নেওয়া একটি স্বশাসিত সংস্থার তরফে, এক ভয়ানক সাংবিধানিক সংকেত দেয়। যে শিক্ষা পর্ষদের আইন অনুযায়ী স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার কথা, সেখানে যদি পর্ষদ শুধুমাত্র শাসকের মুখের দিকে তাকিয়ে নীতি নির্ধারণ করে, তাহলে সেটা আর গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে পড়ে না। বরং সেটি একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। আদালত যে সংবিধানসম্মত নির্দেশ দিয়েছে যে নতুন নিয়োগ পদ্ধতি স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও সকল প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগদানের ভিত্তিতে গঠিত হবে সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের বদলে রাজনৈতিক নেতৃত্বর ঘোষণাকেই পর্ষদ নীতিগত বেদবাক্য বলে মানছে। এতে বিচারব্যবস্থার মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ণ হয়, তেমনই প্রশাসনিক স্বশাসনের ধারণাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে রাজ্যে রাজনৈতিক নির্বাহীই এখন প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারক ভূমিকা এককভাবে দখল করে বসেছে, এবং শিক্ষা-সহ একাধিক ক্ষেত্রের সিদ্ধান্তব্যবস্থায় যুক্তিবাদ, আইন এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
এই রাজনৈতিক প্রবণতা বর্তমানের নিরিখে অনন্য কিছু নয়। বরং এ এক বৃহত্তর জাতীয় প্রবণতার স্থানীয় রূপ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় যেমন প্রশাসনিক স্বশাসনকে একপ্রকার কৌশলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে, তেমনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গে দেখা যাচ্ছে রাজ্য প্রশাসনের প্রতিটি স্তর পর্ষদ, কমিশন, ট্রান্সফার বোর্ড ধীরে ধীরে নবান্ন-কেন্দ্রিক নির্দেশনার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে একটি অভিন্ন শাসন কৌশল, নির্বাচনে জনপ্রিয়তা ও চূড়ান্ত নেতৃত্বের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার জন্য প্রশাসনিক স্বশাসনকে নির্মূল করে দেওয়া এবং সব সিদ্ধান্তকে একক নেতৃত্বের বিবেচনার উপর নির্ভর করানো। মুখ্যমন্ত্রী যেমন নবান্ন থেকে পর্ষদের নিয়োগ নীতি ঘোষণা করেন, প্রধানমন্ত্রী তেমনি দিল্লি থেকে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা নীতির ব্যাখ্যা করে দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের প্রশ্নেও UGC বা অন্যান্য সংস্থার ওপর হস্তক্ষেপ করেন। মোদ্দা কথা, মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী দুজনে রাজনৈতিক অবস্থান, ভাষা ও নীতিতে যত ভিন্নই হোন না কেন, শাসন কাঠামোর গভীরে উভয়ের রাজনৈতিক কৌশলে এক অন্তর্গত মিল রয়েছে। তাঁদের লক্ষ্য একটাই জনতার সঙ্গে এক নেতৃত্বের একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলা, এবং তার মাধ্যমে মধ্যবর্তী সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা। এই শাসনধারা বহিরঙ্গে গণতন্ত্রের রূপ রাখলেও, তার অন্তর্বস্তু ক্রমশ নেতৃত্বনির্ভর একচ্ছত্র আধিপত্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিয়োগ, আইনকানুন - সব ক্ষেত্রেই যুক্তির জায়গা দখল করে নিচ্ছে কর্তৃত্ব। এবং এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ - কারণ যখন যুক্তিকে দমন করে রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রশাসনের নীতি নির্ধারণ করে, তখন গণতন্ত্রের ভিত নড়ে যায়, আর শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার হয়ে পড়ে এক রাজনৈতিক প্রকল্পের উপাদানমাত্র।
এই প্রবণতা যেখানে প্রশাসন, বিচার ও নীতি নির্ধারণ সবকিছুই একটি একক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আজ জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ এই ধারা কেবল নিয়োগ বা শিক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের সংবিধানিক পরিকাঠামো, সামাজিক সাম্য ও প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই প্রবণতার বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়, সেই বিরোধী রাজনীতিই বর্তমানে চূড়ান্ত দিশাহীন। আদালতের নির্দেশ, পর্ষদের অস্বচ্ছতা, বা মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন ঘোষণা সবকিছুর মধ্যেও রাজ্যের বিরোধী দলগুলি যেন কোনও সুসংবদ্ধ অবস্থান নিতে পারছে না। বিজেপির অপারগতা অনুমেয়। তাদের দলনেতারাই এই দুর্নীতি চক্রের অংশ। কিন্তু বাদবাকি বিরোধী দলগুলোও আজ দিশাহীন। গণআন্দোলনের পরিবর্তে তারা নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে, যা একদিকে জনগণের আস্থা হারাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারকে আরও ঔদ্ধত্যপূর্ণ করে তুলছে। শিক্ষকদের যেসব আন্দোলন এই ক'বছরে চোখে পড়েছে, তা মূলত ব্যক্তিগত চাকরির দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। আন্দোলনকারীরা নিরন্তর বলছেন, “আমরা পরীক্ষায় পাশ করেছি, আমাদের নিয়োগ দিন।” এই দাবির যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সমস্যাটি এখানেই তাঁরা আন্দোলনকে কখনও জনশিক্ষার অধিকারের প্রশ্নে রূপান্তরিত করতে পারেননি। আন্দোলনের সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের সংহতি গড়ে তোলার কোনও প্রকৃত প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। ফলে শিক্ষক নিয়োগ আন্দোলন কখনও এক সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনে রূপ নেয়নি। এটি থেকে গড়ে ওঠেনি কোনও বৃহৎ নাগরিক জাগরণ। ঠিক একই পরিণতি হয়েছে অভয়া হাসপাতাল কাণ্ডের ক্ষেত্রেও। চিকিৎসকদের ওপর হামলা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় এবং তাঁদের নিরাপত্তার দাবিও ন্যায়সংগত। কিন্তু সেই আন্দোলনও কেবল চিকিৎসক সমাজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইস্যুতে আটকে রইল। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের অধিকার, চিকিৎসকের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক - এই গভীর প্রশ্নগুলিকে কেউ সামনে আনল না। ফলে আন্দোলনটি সমাজের বৃহত্তর অংশের দাবি হয়ে উঠতে পারল না, এক শ্রেণির পেশাগত নিরাপত্তার আহ্বান হিসেবেই থেকে গেল।
এই অভিন্ন ব্যর্থতা, চাকরিপ্রার্থীর আন্দোলন হোক বা চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা, দু'টি ক্ষেত্রেই সমাজের সঙ্গে আন্দোলনের বিচ্ছিন্নতা দিশাহীনতার মূল কারণ। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও এখানে দায় আছে। তারা আন্দোলনের দাবিকে কখনই নীতি নির্ধারণ অবধি নিয়ে যেতে পারেনি, বরং কখনও বিচ্ছিন্ন সমর্থন, কখনও লোকদেখানো প্রতিবাদের বাইরে এগোয়নি। এই প্রেক্ষিতে একমাত্র পথ সমাজ, আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক বিকল্পের একটি ত্রিমুখী সংহতিতে। শিক্ষক আন্দোলন যদি সমাজের জনশিক্ষার অধিকার প্রশ্নে পরিণত হয়, চিকিৎসকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন যদি নাগরিকের স্বাস্থ্য অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়, এবং বিরোধী দল যদি তাদের অবস্থানকে মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করে, তাহলে তবেই এই কেন্দ্রীভূত, একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। গণতন্ত্রের বাস্তব রক্ষা কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে হয় না, সেটি হয় সমাজের সার্বিক অংশগ্রহণ, প্রতিষ্ঠানিক স্বশাসনের পুনরুদ্ধার, এবং একটি যুক্তিসম্মত বিকল্প কণ্ঠস্বর নির্মাণের মাধ্যমে। যতদিন না এই সম্মিলিত প্রয়াস দেখা যাচ্ছে, ততদিন এই অরাজকতা শুধু চলবে না, বরং ভবিষ্যতের সামনে এক গাঢ় অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।