আরেক রকম ● ত্রয়োদশ বর্ষ একাদশ সংখ্যা ● ১-১৫ জুন, ২০২৫ ● ১৬-৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

গঙ্গার ভাঙনের চক্র

গৌতম হোড়


এ এক অদ্ভুত চক্র। মালদহের দু’শ বর্গ কিলোমিটারের বেশি জমি ভাঙনের ফলে গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়েছে। মুর্শিদাবাদ মিলিয়ে ধরলে তা ৩৫৬ কিলোমিটারের মতো হবে। সরকারি রিপোর্ট বলছে, মালদহে প্রতি বছর দু’শ থেকে তিন’শ হেক্টর জমি গঙ্গায় তলিয়ে যায়। গঙ্গার এই ভাঙনের হাত থেকে বাঁচতে বিপুল পরিমাণ বোল্ডার ইত্যাদি দিয়ে পাড়কে সুরক্ষিত করার চেষ্টা হয়। তার বেশ কিছুটা আবার চলে যায় গঙ্গাগর্ভে। এমনিতেই ফরাক্কা ব্যারেজ-এর কল্যাণে সেখানে সমানে পলি জমতে থাকে, তার সঙ্গে এই পাথর ইত্যাদিও জমা হতে থাকে। ফলে তার জলধারণের ক্ষমতা কমে। বাইরে থেকে দেখা যায় না বলে আমরা এই সমস্যাকে অবহেলা করি বা ধর্তব্যের মধ্যে আনি না, অথবা যেহেতু এই সমস্যা মালদহ ও মুর্শিদাবাদের এবং কলকাতার বাইরের ঘটনা আমাদের খুব বেশি আলোড়িত করে না, তাই আমরা সেভাবে চিন্তিত হই না। কিন্তু বাস্তবে এই সমস্যা রীতিমতো গুরুতর।

নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র বলেছেন,

"In addition to this trapped sediment load, tons of boulders which are used for anti-erosion works along the banks, are too often dislodged and deposited into the river. The construction of a 100-m long spur requires 14,357 tons of boulders. Out of 27 spurs constructed so far upstream of the Farakka Barrage, 20 spurs have been fully or partially swept away." (The Encroaching Ganga and Social Conflicts: The Case of West Bengal, India).

তাহলে গঙ্গার তলদেশে এই বোল্ডারও জমা হচ্ছে। প্রতিবছর ভাঙন রুখতে বোল্ডার ফেলা হচ্ছে, মাটি ফেলা হচ্ছে, সেটাও অনেকাংশে চলে যাচ্ছে গঙ্গাগর্ভে। ভূমিতল উঁচু হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষার তিন মাস গঙ্গা অনেক বেশি করে পলি, বালি, পাথর এনে জমা করছে ফরাক্কায়। তার অনেকটা অংশই ব্যারেজ-এর আগেই থেকে যাচ্ছে - নিচের দিকে যেতে পারছে না। ফলে পলি জমে জমে চর জাগছে; নাব্যতা কমছে। বর্ষার সময় যে বিপুল জলরাশি আসছে, তা ধাক্কা মারছে পাড়ে। গঙ্গা ভেঙে দিচ্ছে তীরবর্তী এলাকা। সেই ভাঙনের চরিত্র ভয়াবহ। মালদহের চরে এমন মানুষও পেয়েছি, যাদের ১১ বার ভাঙনের শিকার হতে হয়েছে।

মালদহের চরগুলির সঙ্গে সম্পর্ক আছে গঙ্গার ভাঙনের, আবার গঙ্গার ভাঙনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ফরাক্কা ব্যারেজ-এর, আর ফারাক্কা ব্যারেজ-এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে কলকাতা বন্দরের নাব্যতার। ফলে বলা চলে, এটা একটা চক্র এবং এই বিষয়গুলি একে অপরের সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত। ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরির পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যই ছিল হুগলি নদীর প্রবাহ বাড়ানো এবং কলকাতা বন্দরকে বাঁচানো। কিন্তু এই নাব্যতা বাড়াতে গিয়ে কি একটা বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে?

১৯৫০-৫১ সাল থেকে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা কমে যাওয়া ও ক্রমাগত পলি জমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচলের সমস্যা প্রবল হতে থাকে। এই সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। চিন্তাভাবনা শুরু হয়, গঙ্গা থেকে জলপ্রবাহ কী করে হুগলি নদীতে নিয়ে আসা যায়, যার ফলে কলকাতায় জলপ্রবাহ বাড়বে। সেই চিন্তার ফসল ফরাক্কা ব্যারেজ প্রকল্প। ১৯৫৭ সালে পরিকল্পনা গৃহীত হল, ১৯৬১ সাল থেকে নির্মাণ কাজ শুরু হল, ১৯৭১ সালে ব্যারেজ-এর মূল কাঠামো তৈরি হল, ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল এই প্রকল্প কার্যকর হল। গঙ্গার উপর ২ হাজার ২৪০ মিটারের বাঁধ নির্মিত হল। ৩৮ কিলোমিটারের ফিডার ক্যানাল তৈরি হল। গঙ্গা ও হুগলি নদীকে যুক্ত করা হল জঙ্গিপুরের কাছে।

বিশেষজ্ঞরা চেয়েছিলেন, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বাড়াবার জন্য ৪০ হাজার কিউসেক জল ফিডার ক্যানাল দিয়ে বইয়ে দিতে হবে। না হলে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানো যাবে না। সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কি তাই হল? সরকারি তথ্য বলছে, বর্ষায় সেটা হয়, কিন্তু গরমে বা অন্য সময়ে হয় না। ২৮ থেকে ৩০ হাজার কিউসেক জল যায়। কেদারনাথ মণ্ডলের মতো অনেকে বলেন, ২৪ হাজার কিউসেকের বেশি জল যায়নি এবং যায় না ফিডার ক্যানাল দিয়ে।

কেদারনাথ মণ্ডল হচ্ছেন মালদহের গঙ্গার চর ও ভাঙন বিশেষজ্ঞ। একসময় বামপন্থী রাজনীতি করতেন। দল যখন ক্ষমতায়, তখন থেকে সেসব ছেড়ে দিয়ে চরের মানুষ এবং ভাঙন নিয়ে আছেন। এই ৮৮ বছর বয়সেও গঙ্গার ভাঙনের খবর পেলে সোজা সেখানে চলে যান। তিনি বেশ কয়েক কিস্তিতে ‘মালদার খবর সাময়িকী’তে ‘ফরাক্কা ব্যারেজ প্রকল্প জনকল্যাণে কতখানি?’ বলে একটা দীর্ঘ লেখা লিখেছেন। কেদারনাথ মণ্ডল পুঁথিপড়া বিশেষজ্ঞ নন, তাঁর আগ্রহ এবং এই বিষয় নিয়ে হাতেকলমে কাজ করার সুবাদে মালদহে সম্ভবত তাঁর থেকে ভালো করে কেউ ভাঙন ও চরকে চেনে না। তাঁর অভিজ্ঞতা হল,

"যেখানে গঙ্গার গভীরতা কমেছে, সেখানে তার জলধারণ ক্ষমতাও কমেছে। জলধারণ ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য গঙ্গা তাই ক্রমাগত পাড় ভাঙছে। এদিকে ফরাক্কার উজানে প্রচুর চর জেগে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, ফরাক্কা ব্যারেজের পূর্বদিকের গেটগুলিতে বালি জমেছে এবং তাতে অন্তত দশটা গেট অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। বীরনগর থেকে শিমূলতলা পর্যন্ত গঙ্গার ভাঙন প্রক্রিয়া চলছে। গঙ্গা তার পশ্চিমমুখী ধারা দিয়ে পূর্ব দিকে ঘেঁষতে শুরু করেছে।"

একটা নদী সমানে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। গঙ্গার মতো নদী তার গতিপথ খুব বেশি করে পরিবর্তন করে। জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পুরোনো ম্যাপ ও উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে ‘ইভলিউশন অফ রিভার কোর্স অ্যান্ড মরফোমেট্রিক ফিচারস অফ দ্য রিভার গঙ্গাঃ আ কেস স্টাডি অফ আপ অ্যান্ড ডাউনস্ট্রিম অফ ফরাক্কা ব্যারেজ’ বলে একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। সেখানে ম্যাপের সাহায্য নিয়ে তাঁরা দেখিয়েছেন, ১৯৬৫ থেকে ২০২৭ পর্যন্ত গঙ্গা বারবার তার গতি পরিবর্তন করেছে। ফরাক্কার আপ ও ডাউনস্ট্রিমে পাড় ভাঙা ও পলি জমার কাজ সমানে চলছে।

গত তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে দিল্লিতে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিবার সংসদে গঙ্গার ভাঙন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, জবাব আসে - গতে বাঁধা জবাব। একটা প্রশ্নোত্তরের উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। ২০২৩ সালে ২০ জুলাই খলিলুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে জলশক্তি প্রতিমন্ত্রী বিশ্বেশ্বর টুডু বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার জানিয়েছে, গত ১৫ বছরে মুর্শিদাবাদে ফরাক্কা, সামশেরগঞ্জ, সুতি এক ও দুই, রঘুনাথগঞ্জ দুই, লালগোলা, ভগবানগোলা দুই, রানিনগর দুই, জলঙ্গী ও দুলিয়ান পুরসভা এলাকার ১,৪৮০ হেক্টর জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে। ভাঙন, পলি জমা, মুভমেন্ট - এ সবই নদীর ন্যাচরাল রেগুলেটিং ফাংশন। তারপর বলা হল,

"Rivers tend to maintain a balance between the silt load carried & silt load deposited, maintaining a river regime. Soil erosion caused by heavy floods is a matter of concern as it leads to several associated problems like changes in river course, causing loss of land, etc. Flood management including erosion control falls within the purview of the States. Flood management and anti-erosion schemes are formulated and implemented by concerned State Governments as per their priority."

অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দিল, এটা রাজ্যের দায়িত্ব। তারাই ভাঙন রোধে কাজ করবে। কেন্দ্র তাদের টেকনিক্যাল সহায়তা দেবে, আর্থিক কিছু সাহায্য করবে। টেকনিক্যাল স্টাডি করার জন্য টিমও তৈরি করা হয়েছে। সেই টিম নিশ্চয়ই তাদের কাজ করেছে বা করছে। তারপর কী হবে? জানা নেই। আর রাজ্য বলে, তারা কেন্দ্রকে টাকা দিতে বলেছে, কিন্তু কেন্দ্র দিচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী গত ৭ মে বলেছেন,

"কেন্দ্রকে ১,৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছি। ওরা কোনো খরচ করছে না। ফরাক্কার জন্য টাকা পাই সেই টাকা দেয়নি। ৮০০ কোটি টাকা দিয়ে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করেছি আরও ১৭৫ কোটি টাকার কাজ হবে।" (নিউজ১৮ বাংলা)।

গত ২০ মার্চ 'ইটিভি ভারত'-এর রিপোর্ট বলছে, সম্প্রতি বিধানসভায় সেচমন্ত্রী মানস ভুঁইয়া ঘোষণা করেছেন,

"ঘাটালের মতো এবার মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গা ভাঙন প্রতিরোধে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হবে।"

প্রশ্নটা হল, এতদিন হয়নি কেন? 'মিলেনিয়াম পোস্ট'-এর ২৪ জুলাই, ২০২৪ সালের রিপোর্ট বলছে,

"Terming the Ganga erosion a ‘serious problem’, Chief Minister Mamata Banerjee during an administrative meeting at the Malda College Auditorium on May 4, 2023 had sanctioned Rs. 50 crore for the current financial year. The work is to be done in phases for the next 10 years."

৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হল। ১০ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে তা খরচ করা হবে। তার মানে গড়ে বছরে পাঁচ কোটি টাকা।

এর ফলে কী হয়? প্রতিবছর বর্ষায় মালদহ, মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকায় গঙ্গাপাড় ভাঙে। মানুষ দেখতে পান, চোখের সামনে তাদের বাড়িঘর, দোকান-পাট, চাষের জমি, রাস্তা, স্কুল সব নদীগর্ভে চলে গেল। তাদের আর সেই জমিতে কোনো অধিকার থাকল না। সব হারানো মানুষগুলি এরপর সরকারি ত্রিপল, কিছু বাসনপত্র পাবেন। তারা এখানে-ওখানে ধাক্কা খাবেন, কেউ চরে গিয়ে আশ্রয় নেবেন। কেউ কাজ খুঁজতে পাড়ি দেবেন ভিন রাজ্যে। কোনো কৃষক হয়ত চরে রসগোল্লার দোকান দেবেন অথবা দিনমজুরের কাজ করবেন। যেমন করছেন ফকির মহম্মদ। তাঁর কাহিনি কেদারদার কাছে শোনা। ভাঙনে চাষের জমি হারানোর পর ফকির চরে রসগোল্লার দোকান দিয়েছিল। সেই দোকান তখন চলেনি। ফকির চলে যান মুম্বই। সেখানে বাইকুল্লায় বাজার করে সেই বাজার ঝুড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেন। সেই কাজ করতে করতে বন্ধুদের দাবিতে ফকির একদিন রসগোল্লা বানায়। একজন সেই রসগোল্লা নিয়ে যায় তাঁর শেঠের কাছে। তারপর শেঠের বাড়িতে নিয়মিত রসগোল্লা বানাতে হয় ফকিরকে। টাকাপয়সা জমিয়ে সে আবার ফিরে আসে চরে। মিষ্টির দোকান দেয়। এখন সেটাই তাঁর জীবিকা। ফকির ভাগ্যবান, শেঠের নজরে পড়ে তাঁর ভাগ্য খুলে গেছে। অন্যরা তো তা নয়।

তবে মানুষ এতদিনে জেনে গেছে, গঙ্গা তার পাড় ভাঙবে, হয়ত দিক পরিবর্তনও করবে, পলি এনে জমা করবে, দুই সরকার বিতণ্ডা করবে। ফরাক্কা ব্যারেজে পলি জমবে, নাব্যতা কমবে, চর জাগবে, ভাঙন হবে। এই চক্রের হাত থেকে সম্ভবত তাদের মুক্তি নেই।